বই আড্ডায় জমজমাট সান্ধ্য লাইব্রেরি

কয়েকজন চুপচাপ দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন, কেউ আবার বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজছেন পছন্দের বই।
বিকালের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। ময়মনসিংহ নগরীর দুর্গাবাড়ী প্রাঙ্গণে একে একে ঢুকতে থাকেন নানা বয়সী মানুষ। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কেউ কর্মদিবস শেষে সরাসরি এসেছেন। কয়েকজন চুপচাপ দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন, কেউ আবার বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজছেন পছন্দের বই। স্মার্টফোনের দখলে চলে যাওয়া এ সময়ে দৃশ্যটি খানিকটা ব্যতিক্রমই বলা যায়। কারণ, দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী পাঠাগার যখন পাঠকশূন্য হয়ে পড়ছে, তখনো দুর্গাবাড়ী পাঠাগারে বিকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত পাঠকের আনাগোনা থাকে।
দুর্গাবাড়ী ধর্মসভার অধীন পরিচালিত এই পাঠাগারে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার বই। গল্প-উপন্যাস, জীবনী, ধর্ম এবং ইতিহাস থেকে শুরু করে নানা বিষয়ের বইয়ের পাশাপাশি রাখা হয় বাংলা ও ইংরেজি ভাষার আটটি দৈনিক পত্রিকা। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৮০ জন পাঠক এখানে আসেন। কোনো সদস্য ফি ছাড়াই বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
পাঠাগারটির বয়স নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও এর শিকড় ১৯ শতকে। ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আর্যধর্ম জ্ঞান প্রদায়িনী সভা’র শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে এই গ্রন্থাগার। একসময় এটি ছিল ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। জমিদার, শিক্ষানুরাগী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা নিয়মিত বই উপহার দিতেন। এখানে সাহিত্যসভা, আবৃত্তি, সংগীতচর্চা, রবীন্দ্র ও নজরুলজয়ন্তী, নববর্ষ এবং বসন্তবরণের আয়োজন হতো নিয়মিত।
তবে সেই গৌরবময় অধ্যায়ের বড় একটি অংশ হারিয়ে যায় ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রন্থাগারের অধিকাংশ সংগ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর স্থানীয় শুভানুধ্যায়ী ও ধর্মসভার সদস্যদের উদ্যোগে আবারও বই, আলমারি এবং আসবাব সংগ্রহ করে নতুন করে গড়ে তোলা হয় পাঠাগারটি। আজকের সংগ্রহ সেই দীর্ঘ পুনর্গঠনেরই ফল।
‘আর্যধর্ম জ্ঞান প্রদায়িনী সভা’র সভাপতি অধ্যাপক বিমল কান্তি দে জানিয়েছেন, তিনি ১৯৬২ সালে কলেজজীবনেও এই পাঠাগারে আসতেন। তার বিশ্বাস, পাঠাগারটি তারও বহু আগে প্রতিষ্ঠিত। তিনি বললেন, ‘পাঠকের সংখ্যা আগের মতো না হলেও এখনো মানুষ আসেন। নতুন প্রজন্মের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই পাঠাগার আবারও জ্ঞানচর্চার প্রাণবন্ত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’




