সংসদে আ.লীগের বিচার ও হাসিনাকে ফেরানোর দাবি, আইনি প্রক্রিয়া চলমান বলছে সরকার

জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের দলগত বিচার দ্রুত সম্পন্নের দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের দলগত বিচার দ্রুত সম্পন্ন এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। জবাবে সরকার জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়ে আলোচনার নোটিশ দেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
আলোচনায় আখতার হোসেন বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের কোনো কার্যকর অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। তিনি অবিলম্বে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার কার্যকর করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে আওয়ামী লীগ। দলটি যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন, তারা এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে না। জুলাইতে যারা হত্যা করেছিল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল, তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর হয়নি। এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকরের দাবি জানান তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শরিক হয়েও সরকারদলীয় কিছু সদস্যের বক্তব্যে অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্যের টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পুলিশি হত্যাকাণ্ডের তুলনা করা হচ্ছে। তার মতে, ‘এই বয়ানটা আওয়ামী লীগের বয়ান।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নতুন করে কোনো মামলার তদন্ত বর্তমান প্রসিকিউশন এগিয়ে নিতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘যেই দল ইতিহাসে দুই দুইবার সুযোগ পেয়ে এদেশে গণহত্যা করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, লুটপাট করেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তার বিচার করতে হবে।’
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল ফলাফলের সময়, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে সাড়ে ১৬ বছরের ইতিহাস। এই সময়ে যারা গুম, খুন ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, তাদের ভুলে যাওয়া আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। জুলাই যোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারের ব্যাপারে কোনো গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না। এই ক্ষমা বহন করার শক্তি জাতির নাই। বিচার হতেই হবে, তবে বিচারটা যেন ন্যায়বিচার হয়।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সবাই নয়, তবে অধিকাংশ গণমাধ্যম স্বৈরাচারকে আরও ভয়ংকর স্বৈরাচারে পরিণত হতে সহায়তা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তার ভাষ্য, ‘এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য মাঠে নেমে পড়েছে তারা। সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কোন শক্তির বলে এটা করে তারা, আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই। তাদের ব্যাপারে দুর্বলতাটা কোথায়?’
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পন্ন হয়েছে ১৬টি তদন্ত। এর মধ্যে ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, চারটি মামলায় চার্জ গঠন হয়েছে এবং তিনটি মামলার রায় হয়েছে। তিনি জানান, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডে জেলা পর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে। যারা আত্মসমর্পণের হুঙ্কার দিচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ থাকবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হবেন। এটা সরকারের অঙ্গীকার।’
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন বলে সংসদকে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বর্তমানে ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আরও ১২টি মামলার তদন্ত শেষ হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় আছে। প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লজিস্টিক সহায়তা আরও বাড়ানো হবে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায়।
আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তাদের আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজন হলে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থে যে যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আইন অনুযায়ী কার্যকর হবে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সরকার তাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর এবং জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম।




