প্রাথমিক শিক্ষায় ‘উচ্চতর’ সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যশোরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যেন একসঙ্গে দুটি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের বিপুল শূন্যপদ, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন। শিক্ষক নেই, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষও নেই— এমন বাস্তবতায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে ‘উচ্চতর’ সংকট। শিক্ষা প্রশাসন চলতি দায়িত্ব আর সাময়িক ব্যবস্থায় বিদ্যালয় সচল রাখার চেষ্টা করলেও শিক্ষক-অভিভাবকরা বলছেন, এতে সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আটটি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ২৮৯টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ১ হাজার ৩০৬টি পদ শূন্য। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের পদই খালি রয়েছে ৬৯১টি, আর সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ ৬১৫টি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক বিদ্যালয় কার্যত পরিচালিত হচ্ছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
তবে শিক্ষক সংকটই প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র সমস্যা নয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ‘ইমার্জেন্সি ইন এডুকেশন’ খাতের চাহিদাপত্র অনুযায়ী, ৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যবহার অনুপযোগী। কোথাও ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাটল। অনেক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই শ্রেণি কার্যক্রম চলছে।
শিক্ষক সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উপজেলাভিত্তিক চিত্রে। মণিরামপুর উপজেলায় ২৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৮টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এ ছাড়া ও সদর উপজেলায় ২৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৬টি, শার্শায় ১২৫টির মধ্যে ৮২টি, চৌগাছায় ১৩৯টির মধ্যে ৭৬টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টির মধ্যে ৭২টি, অভয়নগরে ১১৭টির মধ্যে ৭০টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টির মধ্যে ৬১টি এবং কেশবপুরে ১৩৮টির মধ্যে ৩৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
প্রধান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক ঘাটতিও শিক্ষা কার্যক্রমকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জেলায় প্রাক-প্রাথমিকসহ সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭ হাজার ৯১১টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ৬১৫টি পদ। মণিরামপুরে সংকট সবচেয়ে বেশি। এ উপজেলায় সহকারী শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ১৫৪টি। এ ছাড়া সদরে ১০৭টি, কেশবপুরে ৭৪, শার্শায় ৭২, অভয়নগরে ৫৬, বাঘারপাড়ায় ৫৫, চৌগাছায় ৫৪ ও ঝিকরগাছায় ৪৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি।
শুধু শূন্যপদই নয়, নিয়োগ ও পদোন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি জটিলতা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মামলাজনিত কারণে ৩৭টি পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি আটকে আছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৩৩টি এবং সহকারী শিক্ষকের চারটি পদ রয়েছে।
স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বা চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি নিয়মিত পাঠদানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি যশোর সদর উপজেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষায়, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় বেড়েছে দাপ্তরিক কাজের চাপ। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি না হলে শিক্ষার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এর ফলে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতিও।’
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকট শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি শিক্ষার গুণগত মানের জন্যও বড় হুমকি। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, একটি বিদ্যালয়ের প্রাণ হচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা এবং সহকারী শিক্ষকের ঘাটতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
অবশ্য শিক্ষা প্রশাসন বলছে, সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে। ‘মামলা জটিলতা ও দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় তৈরি হয়েছে এই শূন্যতা। আপাতত চলতি দায়িত্ব দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম’— বললেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) জি এম আলমগীর কবীর। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং শূন্যপদ দ্রুত পূরণ হবে বলে আশা করছেন তিনি।




