বিশ্লেষকদের মত
সরকারি তথ্যের চেয়ে ৫ গুণ বেশি মৃত্যু সড়কে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ। কিন্তু সেসব মৃত্যুর পূর্ণ হিসাব পৌঁছাচ্ছে না সরকারি খাতায়। কারণ, যেসব দুর্ঘটনার কারণে মামলা হয়, মূলত সেগুলোর তথ্যই যুক্ত হয় পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না বলে অভিযোগ সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে ৪ হাজার ৬৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ৬৩৯ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৮১৮ জন।
তবে এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বছরটিতে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ হাজার ৩৫৯ এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৯ হাজার ১১১ এবং আহত ১৪ হাজার ৮১২ জন।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক আগামীর সময়কে জানালেন, দেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করায় সব দুর্ঘটনা যোগ হয় না পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য ব্যবহার করে বিবিএস যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তা অবাস্তব— অভিযোগ করলেন তিনি।
গত ৩০ জুন প্রকাশিত বিবিএসের পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায়। সেখানে গত এক বছরে ২৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯৫ জন। তবে মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ২৫৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২৫৯ জনের। দ্বিতীয় অবস্থানে কুমিল্লা। জেলাটিতে ২৪১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৪২ জন। যদিও এসব দুর্ঘটনার ধরন ও কারণ উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান জানালেন, কুমিল্লার ওপর দিয়ে গিয়েছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক; ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। একই সড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি চলাচল করে ছোট যানবাহনও। মহাসড়কের পাশে হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় বেশি পথচারীদের চলাচলও। কোথাও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, কোথাও আবার ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে সড়ক পার হয়। এসব কারণ বাড়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সড়ক নিরাপত্তা আইনে নিয়মিত মামলা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও দাবি তার।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দিনাজপুর। গত বছর জেলাটিতে ১৮৭টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২০৩ জন। বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে থাকা থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করলেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর দিনাজপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশিদ। তার ভাষ্য, আনফিট গাড়ি ও অদক্ষ চালকের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলেও তুলনামূলক বেশি সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি দুর্ঘটনা থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। ফলে সেগুলো যুক্ত হয় না পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে। আবার অনেক আহত ব্যক্তি পরে হাসপাতালে মারা গেলেও সেই তথ্যও অনেক সময় যুক্ত হয় না মূল দুর্ঘটনার সঙ্গে। এর ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা কম দেখায় সরকারি পরিসংখ্যানে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আগামীর সময়কে জানালেন, সারা দেশের থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে রেকর্ড হওয়া সড়ক দুর্ঘটনার মামলার তথ্য থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে বিবিএসের প্রতিবেদন। ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা থানায় রেকর্ড না-ও হতে পারে, তবে বড় দুর্ঘটনার তথ্য সাধারণত নথিভুক্ত হয়— যোগ করলেন তিনি।
তবে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের ভাষ্য, ‘অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যখন ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের মতো তথ্য প্রকাশ করে, তখন তথ্যের মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। তাই বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পুলিশের তথ্যকেই ধরে নিতে হবে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে।’
পুলিশের তথ্যভাণ্ডারই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত উল্লেখ করে তার পরামর্শ, তথ্যভাণ্ডার করতে হবে আরও পূর্ণাঙ্গ, যাতে দেশের প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয় সেখানে।




