২৬ বছর পরও লেবাননের পুরনো সংকট কেন অমীমাংসিত?

২০০০ সালের মে মাসে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রায় দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান এবং সীমান্ত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু ২৬ বছর পর বাস্তবতা ভিন্ন। লেবানন এখনো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম অস্থির ও জটিল সংকটকেন্দ্র।
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা সব মিলিয়ে দেশটির সংকট আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শরণার্থী লেবাননে আশ্রয় নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব শরণার্থী শিবির কেবল মানবিক সংকটের কেন্দ্রই নয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতারও অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালের কায়রো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হলে দক্ষিণ লেবানন ধীরে ধীরে ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতার ঘাঁটিতে পরিণত হয়। সীমান্তে হামলা-পাল্টা হামলা বাড়তে থাকে এবং অঞ্চলটি ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া লেবাননের গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। ১৫ বছরব্যাপী এই সংঘাত দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় এবং সমাজকে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলে। লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট মারোনাইট খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী সুন্নি মুসলিম এবং পার্লামেন্টের স্পিকার শিয়া মুসলিম হওয়ার অলিখিত প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
একসময় এটি ভারসাম্য রক্ষার উপায় হিসেবে বিবেচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও বিভক্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গৃহযুদ্ধের সময় সিরিয়া, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি সংগঠন এবং বিভিন্ন স্থানীয় মিলিশিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে লেবানন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের চেয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল ‘অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি’ নামে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে লেবাননে প্রবেশ করে। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-কে সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই অভিযানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই লেবাননের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। ইরানের সমর্থনে গড়ে ওঠে হিজবুল্লাহ। যা শুরুতে ছিল ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন।
পরবর্তীকালে সংগঠনটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে হিজবুল্লাহ শুধু একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়; এটি লেবাননের রাজনীতি, সমাজ এবং নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রভাবশালী অংশ।
২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করলেও সংকটের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। জাতিসংঘ প্রত্যাহারকে সম্পূর্ণ বলে স্বীকৃতি দিলেও শেবা ফার্মস অঞ্চল নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে। হিজবুল্লাহ দাবি করে, অঞ্চলটি এখনো ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এবং জাতিসংঘের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ফলে প্রত্যাহার সংঘাতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারেনি।
এর ছয় বছর পর, ২০০৬ সালে, হিজবুল্লাহর অভিযানে দুই ইসরায়েলি সেনা আটক হওয়ার পর পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়। ৩৪ দিনের এই সংঘাতে লেবাননের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। যুদ্ধ শেষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। বরং উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে থাকে।
বর্তমান সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইরানের জন্য হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। অন্যদিকে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে তার সীমান্ত নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে। একই সময়ে সৌদি আরবও লেবাননের সুন্নি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে লেবানন অনেকাংশে ইরান ও সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতারও প্রতিফলন।
সিরিয়ার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিরীয় বাহিনী কার্যত লেবাননে উপস্থিত ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সিরিয়া সেনা প্রত্যাহার করলেও দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি।
গত দুই দশকে যুদ্ধের ধরনও বদলে গেছে। হিজবুল্লাহ এখন ড্রোন, নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম। অন্যদিকে ইসরায়েল গড়ে তুলেছে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং উন্নত সাইবার অবকাঠামো। ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাত অতীতের তুলনায় আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ সীমান্তে হামলা শুরু করে এবং ইসরায়েল পাল্টা সামরিক অভিযান চালায়। ২০২৪ সালে এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। যদিও কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হয়েছে, তবু উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে।
এদিকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি লেবানন ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে। জাতীয় মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যায়, ব্যাংকিং খাত সংকটে পড়ে এবং দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাবকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা সংকট মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
লেবাননের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে মূলত চারটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, হিজবুল্লাহর ভূমিকা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের অভাব। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থ। তৃতীয়ত, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা। চতুর্থত, ফিলিস্তিন প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান না হওয়া, যা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অস্থিরতাকে অব্যাহত রেখেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতি, মধ্যস্থতা এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা গেলেও এখনো এমন কোনো রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়নি, যা সব পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক স্বার্থকে একসঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। এ কারণেই ২০০০ সালের প্রত্যাহারের ২৬ বছর পরও লেবাননের সংকট অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বাস্তবে লেবাননের সংকট কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। তাই শুধু যুদ্ধবিরতি বা সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতা। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লেবাননের শান্তি ও স্থিতিশীলতা অনিশ্চিতই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ, রয়টার্স, এপি, সিইআর এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন










