হরমুজে নতুন মার্কিন হামলা, যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই শেষের পথে?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় মার্কিন সামরিক হামলার খবর এমন সময় এসেছে, যখন দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে চলেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যুদ্ধবিরতি কি ভেঙে পড়ছে, নাকি এটি আলোচনার টেবিলে চাপ বাড়ানোর আরেকটি কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও।
কী ঘটেছে?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে মাইন স্থাপন এবং ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন বাহিনী সেই হুমকি মোকাবিলায় অভিযান পরিচালনা করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও বলেছেন, ‘হামলার লক্ষ্য ছিল মাইন স্থাপনকারী নৌযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি যেকোনো মূল্যে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে দেশটির সংবাদমাধ্যম বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান দাবি করেছে, তারা একটি ‘শত্রু স্টেলথ ড্রোন’ ভূপাতিত করেছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও কেন হামলা?
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরও ছোটখাটো উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেনি; বরং নিজেদের সেনা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য সীমিত পরিসরে অভিযান চালিয়েছে। তবে ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। তেহরান এই হামলাকে চাপ সৃষ্টি কিংবা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে দেখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ইতিহাস বলছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও ‘আত্মরক্ষামূলক অভিযান’ নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা প্রায়ই ভিন্ন হয়। আর সেখান থেকেই নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়।
হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ চলাচল করে।
সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানির জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। যদি হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আলোচনার টেবিলে কী হচ্ছে?
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছেছে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হতে যাচ্ছে—এমন দাবি করা যাবে না।’
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে আলোচনার মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়; বরং যুদ্ধ বন্ধ করা এবং উত্তেজনা কমানো। অর্থাৎ উভয় পক্ষ আপাতত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।
ট্রাম্পের অবস্থান কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে সামরিক চাপও বজায় রাখছেন।
তিনি বলেছেন, আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। তবে সমঝোতা না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত চাপ ও আলোচনার সমন্বিত কৌশল।
ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চান, যা তার প্রশাসনের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে। সে কারণে ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক উপস্থিতিও বজায় রাখছে।
শান্তি আলোচনার সামনে কী বাধা?
সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিরোধ দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক হামলাও সেই অবিশ্বাস আরও বাড়াতে পারে। আলোচনার টেবিলে অগ্রগতি হলেও মাঠের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইসরায়েলের ভূমিকা এবং ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ড এসব বিষয়ও আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই শেষের পথে?
এই মুহূর্তে সরাসরি বলা কঠিন যে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র হামলাকে সীমিত সামরিক অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করছে এবং ইরানও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার ঘোষণা দেয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ানক। যদি নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়, জাহাজে হামলা বাড়ে কিংবা হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে দোহার আলোচনা যদি ইতিবাচক ফল দেয়। তাহলে বর্তমান উত্তেজনা সাময়িক হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। প্রথমত, আলোচনা সফল হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির পথ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমিত সংঘর্ষ এবং কূটনৈতিক আলোচনা একই সঙ্গে চলতে পারে, যা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। তৃতীয়ত, কোনো ভুল হিসাব বা আকস্মিক সামরিক ঘটনার কারণে পরিস্থিতি বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল বোঝাবুঝি। কারণ হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল এলাকায় ছোট একটি ঘটনা থেকেও বড় সংঘাতের সূচনা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা প্রমাণ করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি এখনো নিশ্চিত নয়। একদিকে দোহায় কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
ফলে যুদ্ধবিরতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, তবে সেটি যে চাপের মুখে রয়েছে, তা স্পষ্ট। আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং দুই পক্ষের সামরিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির দিকে এগোবে, নাকি আবারও বড় সংঘাতের মুখোমুখি হবে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, এপি






