বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে হরমুজ প্রণালি খুলতেই হবে

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা, অবিশ্বাস ও সংঘাতের প্রতীক। দুদেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনার খবর সাধারণত কূটনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ চলমান আলোচনা শুধু দুই প্রতিপক্ষ দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান এমন একটি সমঝোতার দিকে এগোতে পারে, যার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে। আলোচনায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ও রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
ইরানে নতুন মার্কিন হামলা
২৬ মে ২০২৬
এই সম্ভাব্য সমঝোতা সফল হলে এর সুফল শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিতে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়ে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পরিবহন ব্যয়, জাহাজ বিমার খরচ ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। যদি দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধান না আসে, তাহলে এই সংকট আরও বিস্তৃত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অনেকেই মনে করতে পারেন, জ্বালানির দাম কিছুটা বাড়লে সেটি মূলত উন্নত দেশগুলোর সমস্যা। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলো অবশ্যই এর প্রভাব অনুভব করবে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুতের খরচ বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হবে।
এরই মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে থাকা জনগণ ও সরকারগুলো নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চলের দেশ এখনো আমদানিকৃত জ্বালানি, সার ও খাদ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মানে শুধু পেট্রল বা ডিজেলের দাম বাড়া নয়; বরং পুরো অর্থনীতিতে তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়া।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়ে। সার উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। সরকারগুলো জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে ভর্তুকি বা জরুরি সহায়তা বাড়াতে বাধ্য হয়। এতে সরকারি অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতা এরই মধ্যে দৃশ্যমান।
আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি আমদানিনির্ভর দেশ বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে ব্যস্ত। একই সঙ্গে তারা বাড়তি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাজস্ব সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, মূল্যস্ফীতির চাপ তত বাড়বে এবং অনেক দেশের বিদ্যমান ঋণ সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, এটি এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ‘চোকপয়েন্ট’-এর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি তার মধ্যে অন্যতম।
এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি জলপথ নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান ধমনিগুলোর একটি। যখন এই পথ আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বা সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন তার অভিঘাত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়। খাদ্যবাজারও এর বাইরে নয়।
অনেক সময় মনে করা হয় জ্বালানি সংকট ও খাদ্য সংকট আলাদা বিষয়। বাস্তবে এই দুই খাত গভীরভাবে পরস্পর-নির্ভরশীল। সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য পরিবহন, সংরক্ষণ এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থাও তেল ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত খাদ্যদ্রব্যের দামেও দেখা যায়।
অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করে না; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে।
এক দশকেরও বেশি আগে আরব বসন্তের আগে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি জনঅসন্তোষ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি রাজনৈতিক অস্থিরতাকে উসকে দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ এমনিতেই উচ্চ ঋণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যদি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও খাদ্য সংকট যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী এই সংকটের সবচেয়ে বেশি শিকার হবে, তাদের অনেকেরই এই ভূরাজনৈতিক সংঘাতে কোনো ভূমিকা নেই।
তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের অংশ নয়, কিন্তু বাড়তি আমদানি ব্যয়, খাদ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার বোঝা তাদেরই বহন করতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রেই বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের মূল্য দরিদ্র দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়— পণ্যমূল্য, ঋণব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক নির্ভরতার মাধ্যমে।
এই কারণেই হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি চালু হওয়া শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরানের কৌশলগত স্বার্থের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি জরুরি প্রয়োজন। অবশ্য সমঝোতার পথ মোটেও সহজ নয়। নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌচলাচলের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে এখনো গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে কার কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিও আলোচনার একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
এর আগে বহুবার আলোচনা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে গেছে। অবিশ্বাস, রাজনৈতিক চাপ এবং সামরিক উত্তেজনা বারবার সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বর্তমান আলোচনাও যে সফল হবেই, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু বাস্তবতা হলো, বিকল্প পথ আরও বিপজ্জনক।
যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা বিশ্ব জুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, খাদ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করবে, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে চাপে ফেলবে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান আলোচনা শুধু দুদেশের সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি আসলে এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর নির্ধারণ করতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন আরেকটি সংকটের দিকে যাবে, নাকি কিছুটা স্বস্তির সুযোগ পাবে।
আজকের বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালি অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক— কোনো অর্থেই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগ নেই। কারণ এর মূল্য শেষ পর্যন্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে। আর সেই কারণেই, বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে এখন একটি কার্যকর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
লেখক: ইলান কাপুর, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নবিষয়ক অধ্যাপক
* আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর মনির হোসেন রনি










