গাজা নিয়ে ইসরায়েলের শেষ পরিকল্পনা কী?
- গাজার ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর
- ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারের বদলে নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে
- আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নীতি বদলায়নি ইসরায়েল
- গাজা ঘিরে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানের পরও গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা একসময় যুদ্ধ অবসানের আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—প্রত্যাহারের বদলে গাজায় নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্ত করছে ইসরায়েল।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত নির্ধারিত সীমারেখার পেছনে অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল। ওই অবস্থান থেকেও ধাপে ধাপে পূর্ণ প্রত্যাহারের বিষয়টি নির্ধারণ হওয়ার কথা ছিল পরবর্তী আলোচনায়। তবে সেই প্রত্যাহার এখনো হয়নি। বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, গাজার ভেতরে ইসরায়েল নতুন সামরিক অবকাঠামো, অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ এলাকা বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যায় গাজার বড় অংশ। এতে উপত্যকার বাসিন্দাদের চলাচল ও বসবাসের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
যদি ইসরায়েলের উদ্দেশ্য গাজার ওপর স্থায়ী কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি সংযুক্তিকরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে
এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন করে গাজার আরও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘আমরা এখন গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছি। আগে ছিল ৫০ শতাংশ।’
এ সময় উপস্থিত একজন ‘১০০ শতাংশ’ নিয়ন্ত্রণের কথা বললে নেতানিয়াহু জবাব দেন, ‘ধাপে ধাপে এগোই। আগে ৭০ শতাংশ দিয়ে শুরু করি।’
তার এই মন্তব্যের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েলের লক্ষ্য কি শুধুই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি গাজায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা?
ইসরায়েলের দাবি, তাদের সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা ঠেকানো। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকেই তেল আবিব বলে আসছে, গাজা থেকে নিরাপত্তা হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ২০২৪ সালের মতামতেও জানিয়েছে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, গাজার ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক স্থাপনা তৈরি এবং নিয়ন্ত্রণ এলাকা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু নিরাপত্তা অভিযানের সীমার মধ্যে থাকছে না। তাদের আশঙ্কা, অস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের রূপ নিতে পারে।
ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকার আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘যদি ইসরায়েলের উদ্দেশ্য গাজার ওপর স্থায়ী কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি সংযুক্তিকরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
তিনি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২৪ সালের মতামতেও জানিয়েছে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।’
গাজার আয়তন মাত্র প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। যুদ্ধের আগে এই ছোট ভূখণ্ডে প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ জায়গা দ্রুত কমে আসছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরসহ (ওসিএইচএ) বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করেছে, সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের কারণে গাজার আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও মৌলিক প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, গাজার বিভিন্ন এলাকায় চরম খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। শিশু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করছে, মানবিক সংকটের জন্য হামাসের কার্যক্রম এবং সহায়তা বিতরণের সমস্যাও দায়ী। তবে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর অভিযোগ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাণ প্রবেশে বাধার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইসরায়েলি কয়েকজন মন্ত্রীর ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ পরিকল্পনার বক্তব্য ঘিরে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, ‘গাজা থেকে ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসনের পরিকল্পনা’ যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।’
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে এলাকা ছাড়তে উৎসাহিত করা প্রকৃত অর্থে স্বেচ্ছায় স্থানত্যাগ নয়; বরং এটি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময়, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি এখনো অস্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজা নিয়ে ইসরায়েলের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, স্থায়ী বাফার জোন তৈরি, হামাসবিহীন নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন অথবা ধীরে ধীরে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা।
শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যাবে, নাকি বর্তমান নিয়ন্ত্রণই ভবিষ্যতের নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, যুদ্ধবিরতির পরও গাজার মানচিত্র, মানুষের জীবন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক হিসাব সবকিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স, জাতিসংঘের ওসিএইচএ, আইপিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিএফআরের প্রতিবেদন।











