হরমুজ খুললেও দ্রুত স্বাভাবিক হবে না তেল সরবরাহ

সংগৃহীত ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে—এমন খবর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো কিংবা হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের সীমাবদ্ধতা কমানোর সিদ্ধান্ত এখনই বৈশ্বিক তেল সংকটের সমাধান নিশ্চিত করছে না।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে।
এমন খবরের পর তেল ব্যবসায়ী ও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ দেখা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই স্বস্তি অকাল হতে পারে। কারণ, এখনো সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদন দেননি। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচনা এখনো শেষ হয়নি। চুক্তি হলেও পরিস্থিতি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইউবিএস এভিডেন্স ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০টি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা কমে দিনে প্রায় চারটিতে নেমে এসেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ স্বাভাবিক করতে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়।
সমুদ্রপথ থেকে সম্ভাব্য মাইন অপসারণ, আটকে থাকা জাহাজ পুনর্বিন্যাস এবং বীমা কোম্পানিগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ফরাসি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সোসিয়েতে জেনেরালের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়ার পরও ক্রেতাদের হাতে স্বাভাবিকভাবে তেল পৌঁছাতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। তবে জাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞ ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের অনেকে মনে করছেন, এই সময়সীমাও আশাবাদী হিসাব হতে পারে।
বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ হলো ৬০ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেও বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক নাও হতে পারে।
এর পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূল বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। ফলে সাময়িক সমঝোতার পরও নতুন উত্তেজনার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ভবিষ্যতেও হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চাইতে পারে। এমনকি জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ বা মাশুল আরোপের বিষয়ও সামনে আসতে পারে।
আগেও দেখা গেছে, আলোচনার পরিবেশ দ্রুত বদলে যেতে পারে। একসময় উভয় পক্ষ হরমুজ দিয়ে অবাধ চলাচলের কথা বললেও পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বৈশ্বিক তেলবাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল ছাড় করেছে। কিন্তু এসব মজুত সীমিত। দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ সংকট চলতে থাকলে বাজারে বড় ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অস্থায়ী ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের বড় একটি অংশ সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের নীতিগত সিদ্ধান্তও পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। এখন পর্যন্ত দেশটি তেল কেনা ও শোধন কার্যক্রম কিছুটা কমিয়ে রাখায় অন্য ক্রেতাদের জন্য সরবরাহ সহজ হয়েছে। তবে চীন আবার চাহিদা বাড়ালে বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময় যত যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি তত বড় জ্বালানি সংকটের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে।
যদি ইরান মনে করে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তার দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তাহলে পারমাণবিক আলোচনা ও আঞ্চলিক বিষয়ে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
তাই সম্ভাব্য ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হরমুজ সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি হয়তো বড় সংকটকে কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে।
সোসিয়েতে জেনেরালের জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অস্থিরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নয়; এটি পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় পরীক্ষা। কারণ বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন এই সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। তাই এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাময়িক যুদ্ধবিরতি বাজারকে স্বস্তি দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ জাহাজ চলাচল, আস্থার পরিবেশ এবং রাজনৈতিক সমাধান। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটন–তেহরানের মূল বিরোধ অমীমাংসিত থাকলে হরমুজ সংকট আবারও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ইউবিএস এভিডেন্স ল্যাব, সোসিয়েতে জেনেরাল ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন






