পদোন্নতির আড়ালে কী চলছিল বিমানে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সব ধরনের পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত এ নির্দেশনা বহাল থাকবে। এর ফলে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিমান-১ শাখা থেকে গত সোমবার (৩ আগস্ট) জারি করা এক চিঠিতে জানানো হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার গ্রুপ-৫ ও গ্রুপ-৬ পদে পদোন্নতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্প্রতি গৃহীত সব পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডোর মো. মনজুর-ই-আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের তদন্তাধীন। বিস্তারিত জানতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।’
অভিযোগটি করেছেন বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মকর্তা আবু সাইদ। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে একটি চক্র প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থেকে ১৫টি অনুমোদিত পদ প্রত্যাহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতির প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। গত ২৮ জুন এ বিষয়ে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির পার্ট-১৪৫ বিধিমালার আওতায় অনুমোদিত জনবল কমিয়ে দেওয়ায় অপারেশনাল নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষ দিকে যোগ দেওয়া কয়েকজন কনিষ্ঠ কর্মীকে অস্বাভাবিকভাবে গ্রুপ-৬ পদে পদোন্নতি দিতে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩১ লাখ টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আটজন যোগ্য প্রকৌশলীর পদোন্নতির ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা, লাইসেন্স ভাতা বন্ধ রাখা এবং কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা, বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকার ছাড়াই পদোন্নতি দেওয়া, বদলির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পদ শূন্য দেখানো, পরে আবার আগের পদে ফিরিয়ে আনা, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া, টেকনিক্যাল দায়িত্ব পালন না করেও ভাতা প্রদান, কাগজে-কলমে ভিন্ন পদায়ন দেখানো, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং এক পদে নিয়োগ দিয়ে অন্য পদে কাজ করানোর মতো নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাংগঠনিক কাঠামোয় অস্তিত্ব না থাকা পদেও বেতন দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়ালে শাস্তির পরিবর্তে তাকে অন্য বিভাগে বদলি করার অভিযোগও রয়েছে।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগ নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই ধরনের কৌশলে একাধিক ব্যক্তিকে একই পদে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনাও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা, অভিযোগ বা আদালতে বিচারাধীন মামলা রয়েছে কি না, সে তথ্য জরুরি ভিত্তিতে চাওয়া হয়েছে। প্রশাসন, তদন্ত, নিরাপত্তা ও আইন শাখাকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, অভিযোগে পদ পুনর্বিন্যাস, পদোন্নতি, সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির বিধিমালা প্রতিপালন, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনসহ একাধিক গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। তবে অভিযোগের সঙ্গে যাচাইকৃত প্রামাণ্য দলিল সংযুক্ত না থাকায় তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতি আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত তদন্ত শেষ না হলে কর্মপরিবেশ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।





