বিমানের উড়াল ফের লোকসানের পথে
- ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট
- বন্ধ হয় গত বছরের ১ জুলাই, ফের চালু হচ্ছে ২৭ জুলাই
- সমীক্ষা ছাড়াই সিদ্ধান্ত, তবু আশাবাদ সরকারের

সংগৃহীত ছবি
এক বছর আগের ঘটনা। টানা লোকসানের কারণ দেখিয়ে ঢাকা-নারিতা রুট বন্ধ করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এখন ঠিক সে রুটেই আবার ফিরছে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি। ২৭ জুলাই থেকে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট দিয়ে নতুন করে এর যাত্রা শুরু হচ্ছে। তবে আগের লোকসানের কারণ দূর হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। সমীক্ষা ছাড়াই রুট চালুর সিদ্ধান্ত, একদিকে সরকারের আশাবাদ— অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা; সব মিলিয়ে ঢাকা-নারিতা রুট আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।
বিমান সূত্র বলছে, এবারও রুটটি চালুর আগে কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। ব্যবসায়িক বাস্তবতার চেয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, আপাতত সপ্তাহে একটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দিয়ে ২৭ জুলাই প্রথম ফ্লাইট উড়বে। এর মধ্যে টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে এবং উদ্বোধনী ফ্লাইটের প্রায় ৮০ শতাংশ আসন বিক্রি হয়ে গেছে। ঢাকা-নারিতা রুটে বিমানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ১৯৮১ সালে একবার সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ হলেও পরে তা আবার চালু হয়; কিন্তু ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ২০০৬ সালে আবারও রুটটি স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর আবার চালু করা হয় নারিতা ফ্লাইট। তখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া রুটটি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সে সময় বিষয়টি অর্থনৈতিক প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাতেই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিমানের সম্প্রসারণে নতুন পরিকল্পনা নেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা) চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ও পুরনো আন্তর্জাতিক রুট সক্রিয় করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুন সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম ঘোষণা দেন, ২৭ জুলাই থেকে আবার চালু হচ্ছে ঢাকা-নারিতা-ঢাকা রুট।
মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। জাপানে বাংলাদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। এসব কারণে যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করা গেলে এই রুট দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।
তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। পরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়া এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় ধাপে ধাপে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো হবে।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করছেন, ঢাকা-নারিতা রুটের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে। তার ভাষায়, জাপানে বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়িক বাজার রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী। নতুন কোনো আন্তর্জাতিক রুটকে লাভজনক হতে সময় লাগে। ঠিক যখন রুটটি প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছিল, তখনই সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে যাত্রী ও ব্যবসায়িক মহলে নেতিবাচক বার্তা গেছে। তবে সপ্তাহে মাত্র একটি ফ্লাইট দিয়ে এ রুটকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করা কঠিন। তার মতে, অন্তত সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় ব্যবসায়িক যাত্রীরা আগ্রহ হারাবেন। কারণ, কেউ দু-তিন দিনের সফরে জাপান যেতে চাইলে তাকে ফেরার জন্য এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে, যা ব্যয়বহুল ও অস্বস্তিকর।
অন্যদিকে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলামও মনে করেন, সপ্তাহে একটি ফ্লাইট দিয়ে লাভজনক হওয়া সম্ভব নয়। এতে যাত্রীরা বিকল্প এয়ারলাইনসের দিকে ঝুঁকবেন।
তার মতে, এই রুটের জন্য বিমানের বর্তমান বহরে সবচেয়ে উপযোগী উড়োজাহাজ নেই। এয়ারবাস এ৩২১ ধরনের উড়োজাহাজ এ রুটের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারত। যেহেতু এমন উড়োজাহাজ বিমানের কাছে নেই, তাই প্রয়োজনে মধ্যবর্তী কোনো দেশে ট্রানজিট নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা অথবা যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বেশি কার্গো বহনের সক্ষমতাসম্পন্ন উড়োজাহাজ ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।




