২০ দিনে লোডশেডিং বেড়ে ৭ গুণ
- সব রেকর্ড ভেঙে লোডশেডিং ৩৭৫৭ মেগাওয়াটে
- স্বাভাবিক হয়নি এলএনজি সরবরাহ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভ্যাপসা গরম। তার ওপর হুটহাট উধাও বিদ্যুৎ। দিন কি রাত, স্বস্তি নেই কোথাও। থেমে যাচ্ছে কারখানার চাকাও। এক সংকটের মেঘ কাটতে না কাটতেই আরেক টানাপড়েন। সব মিলিয়ে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে দেশে লোডশেডিং বেড়ে হয়েছে প্রায় সাত গুণ।
সংকটের শুরু গত ২১ জুলাই। ওইদিন কক্সবাজারের মহেশখালীতে বিকল হয় এলএনজি টার্মিনাল। কমতে থাকে গ্যাস সরবরাহ। এরপর যুক্ত হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা সংকট। একই সঙ্গে বাড়ে তীব্র গরম ও বিদ্যুতের চাহিদা। এতে হু হু করে বাড়ে লোডশেডিং। সব রেকর্ড ভেঙে লোডশেডিং এখন দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত শেষে গতকাল সোমবার থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। একদিকে গ্যাসসংকট, অন্যদিকে মাঝেমধ্যেই উধাও বিদ্যুৎ। গ্যাস-বিদ্যুতের এই ঘোর সংকটে জেরবার জনজীবন। তবে দু-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে— এমন আশাবাদের কথা শোনালেন সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্তারা।
সপ্তাহ-তিনেক আগেও এতটা খারাপ ছিল না পরিস্থিতি। বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় লোডশেডিং ছিল অনেক কম। এলএনজি টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪৮৮ মেগাওয়াট। এর আগের দিন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় লোডশেডিং হয় ২০৯ মেগাওয়াট। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাড়তে থাকে সংকট। কিছুদিন পর কয়লাসংকটে কয়েকটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কমে আসে উৎপাদন। অন্যদিকে গরম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। এতে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে লোডশেডিং। সবশেষ গতকাল সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ওই সময় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানালেন, গ্যাসসংকটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটাকে কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে নানা উপায়ে। আজও (গতকাল) পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারতের আদানির সঙ্গে বৈঠক করেছি। দু-এক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানালেন, সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তর (আনলোডিং) এবং তা কেন্দ্র পর্যন্ত পরিবহনে সময় বেশি লাগছে। সে কারণেই মূলত উৎপাদন কমেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে উৎপাদন বাড়বে।
ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বাংলাদেশে। কয়েক দিন ধরেই তা কমে গড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতের ঝাড়খণ্ডে। সেখানে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় তা ঠিকমতো পোড়ানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল রাতে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে আগামীর সময়কে জানানো হয়, আগামীকাল বুধবার সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। তখন পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৫ হাজারের মতো। গতকাল রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট সচল হওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন। আগে আরও কম ছিল।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা থেকেও উৎপাদন হচ্ছে কম, তিনটির মধ্যে দুটি ইউনিট বন্ধ আছে কারিগরি কারণে। পাশাপাশি আরও কিছু কেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানিসংকটের কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে আরও কয়েক দিন: মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি দু-তিন দিনের মধ্যে পুরোপুরি মেরামত শেষে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। এমন আশার কথা জানালেন বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব। এর আগেও একাধিকবার এই মেরামতের সময়সীমা পেছানোর বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বললেন, ‘আসলে কাজটা জটিল ও স্পর্শকাতর। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যারা (মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি) টার্মিনালটি মেরামত করছে, তারা যেভাবে তথ্য দিচ্ছে, আমরা সেভাবেই বলছি। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে।’
এলএনজি টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে মোট সরবরাহ ২১৪ কোটি ঘনফুটে নামে। ১৫ দিন পর আংশিক মেরামত শেষে কম-বেশি ২৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বেড়েছে। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়বে।
বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন-সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এজন্য অন্তত ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে কখনোই চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। গ্যাসসংকটের কারণে ন্যূনতম ১২০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা গেলেও পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এলএনজি টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরবরাহ করা হয় ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে। গতকাল অল্প কিছু সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন কিছুটা বাড়ে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৩৮০০ থেকে ৪০০০ মেগাওয়াটের মতো। কিছুদিন আগেও উৎপাদন হতো সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে ভর্তুকি অস্বাভাবিক হারে বাড়বে। পাশাপাশি বকেয়া পরিশোধ না করায় জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার কারণেও উৎপাদন কমেছে। তবে গ্যাস-কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কমবে। কিন্তু পুরোপুরি মুক্ত হওয়া আপাতত সম্ভব না। কারণ উৎপাদন-সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি এবং অর্থের সংকট রয়েছে। অবশ্য আবহাওয়া শীতল থাকলে চাহিদা কমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।




