৭ মাসে মারধরের শিকার ৪৪১ পুলিশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ৪৪১ পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, বছরের শুরু থেকেই ঘটেছে একের পর এক হামলার ঘটনা।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে আহত হয়েছেন ৫১ জনের বেশি। এর আগে ২০২৫ সালে দায়িত্ব পালনকালে হামলায় আহত হন ৬০১ জন। সব মিলিয়ে গত ১৯ মাসে পুলিশের ওপর হামলায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪২ জন সদস্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি প্রথম দুই মাসেই ৮২ জন করে পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হয়েছেন। মার্চে ৬৩, এপ্রিলে ৬৬, মে মাসে ৫৫, জুনে ৫১ এবং জুলাইয়ে ৪২ জন আহত হন।
পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাতকড়াসহ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে পুলিশের কাছ থেকে। কোথাও আবার থানায় ঢুকে পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করা হচ্ছে। সড়কে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হচ্ছেন ট্রাফিক পুলিশ।
সর্বশেষ সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশের দাবি, এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম নামে এক প্রাইভেট কারচালক জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড যুবদলের নেতা বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে হামলায় আহত হন ৬০১ পুলিশ সদস্য। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪, জুলাইয়ে ৩৯, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ এবং ডিসেম্বরে ৪১ জন আহত হন।
মহানগর পুলিশের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৪২ জন সদস্য। ২০২৫ সালে ডিএমপির ৮৯ সদস্য হামলায় আহত হয়েছিলেন।
রেঞ্জ পুলিশের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে আহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে।
শুধু অভিযান কিংবা আসামি গ্রেপ্তারের সময়ই নয়, সড়কে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
২০২৫ সালের ১০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য শাহীন হোসেনের ওপর সমন্বয়ক পরিচয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। একই দিন সাভারে এক নারী কনস্টেবলকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।
গত বছরের ১ মার্চ যশোরে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক কনস্টেবল কে এম শরিফুল ইসলামের নাকে ঘুসি মেরে জখম করার অভিযোগ ওঠে শাওন ইসলাম সবুজ নামে এক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর নরসিংদীতে সড়ক পরিবহনের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হামলায় আহত হন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। রাজধানীর পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলামসহ আরও তিন পুলিশ কর্মকর্তাও সম্প্রতি সড়কে হামলার শিকার হয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুধু বাহিনীর মনোবলকেই আঘাত করছে না, এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। পুলিশ দুর্বল হয়ে পড়লে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা আগামীর সময়কে বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তার ভাষায়, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে সদস্যরা সাহস পাবেন এবং নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করবেন না।’
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদও পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পিআরবি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজেদের দপ্তরে বসে না থেকে মাঠে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
নূর মোহাম্মদ বলেছেন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখার সাহস পুলিশকে দিতে হবে। পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপদ ভাববে না। এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়তে বাধ্য।








