নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে সময়মতো আসেন ১০ হাজারে ১ জন স্ট্রোকের রোগী
- রোগীকে আসতে হবে স্ট্রোকের সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছান ১৪ ঘণ্টায়
- স্ট্রোকের লক্ষণ না বোঝা সেবাটি না নিতে পারার মূল কারণ
- মাসে রোগী কমবেশি ৬৫ হাজার থ্রম্বোলাইসিস ওষুধ পান ৬-৮ জন
- প্রতি লাখে স্ট্রোকে মৃত্যু ৬৭.৪%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এ সময়ের মধ্যে রোগী হাসপাতালে এলে থ্রম্বোলাইসিস ওষুধ প্রয়োগের সুযোগ থাকে। এতে রোগীর মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জমাট রক্ত গলে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ফিরে আসে। কিন্তু রাজধানীর নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে হাজারেও একজন স্ট্রোকের রোগী থ্রম্বোলাইসিস সেবাটি নিতে পারেন না। প্রায় ১০ হাজারে মাত্র একজন এ সেবা নিতে পারেন। অর্থাৎ রোগীরা ওষুধটি প্রয়োগের সময়কাল সাড়ে চার ঘণ্টা পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান।
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের স্ট্রোক ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর হোসেন বলেছেন, স্ট্রোকের রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ প্রকাশ পেলে অপেক্ষা না করে দ্রুত উপযুক্ত হাসপাতালে নিতে হবে। কুসংস্কার ও টোটকা চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ করা যাবে না।
দেশে স্নায়ুরোগ ও মস্তিষ্কের চিকিৎসার একটি শীর্ষস্থানীয় বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল হচ্ছে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, স্ট্রোক ক্লিনিক ও স্ট্রোক ইউনিট মিলিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ২ হাজার ১০০ জন স্ট্রোকের রোগী আসেন। মাস শেষে স্ট্রোক করে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় কমবেশি ৬৫ হাজারে। আর পুরো মাসে থ্রম্বোলাইসিসের আওতায় আনা যায় মাত্র ছয় থেকে আটজন রোগীকে। ২০২৫ সালে ৭৯ জনকে এ সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ জনই পুরুষ।
দেশে থ্রম্বোলাইসিসের সুবিধা এখনো গুটিকয়েক হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে এ সুবিধা রয়েছে। এর বাইরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এ সেবা মেলে।
নিউরো বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দুই ধরনের স্ট্রোক আছে, হেমোরেজিক ও ইসকেমিক। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ হলো ইসকেমিক স্ট্রোক, যাতে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। থ্রম্বোলাইসিস ওষুধ ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় প্রয়োগ করা হয়। এতে মস্তিষ্কের জমাট রক্ত গলে যায়। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক রোগীর জন্য এই চিকিৎসা উপযুক্ত কি না, তা নির্ধারণ করেন। তবে সাড়ে চার ঘণ্টার পর এলে এই ওষুধটি আর প্রয়োগ করা যায় না।
হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের মেরুন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক মাহ্মুদুল ইসলাম বলেছেন, স্ট্রোক দেশে দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের মূল এবং মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ অল্পসংখ্যক রোগী এই থ্রম্বোলাইসিস সেবাটি নিতে পারেন। বাকি ইসকেমিক স্ট্রোকের রোগীদের মূলত চিকিৎসা করা হয়, যাতে পরে আর স্ট্রোক না হয়। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও স্ট্রোকের লক্ষণ না বোঝা এ সেবাটি না নিতে পারার মূল কারণ বলে জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
শনির আখড়ার বাসিন্দা ইয়াসিন মোল্লা (৪৭) স্ট্রোক করেন ভোর ৫টার দিকে। শুরুতে রক্তচাপ বেড়েছে ধরে নিয়ে ওষুধ খান। অবস্থার উন্নতি না হলে সকাল ৮টার দিকে ফার্মেসি থেকে লোক আনান। ততক্ষণে ইয়াসিনের মুখ একদিকে বেঁকে গেছে। প্রেশার মেপে ফার্মেসির লোক দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরে সিটি স্ক্যান করা হয়। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট পাওয়ার পর ইয়াসিনকে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রেফার করা হয়। এই হাসপাতালে পৌঁছান দুপুর ২টার কিছু পর— অর্থাৎ ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে ৯ ঘণ্টা। তখন আর থ্রম্বোলাইসিস ওষুধ দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
ইয়াসিনের ছোট বোন খাদিজা আক্তার (৩৯) বলেছেন, ‘ভোরে রাস্তায় জ্যাম থাকে না। বুঝতে পারলে স্ট্রোকের দুই ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতালে আনা যেত। ভাই পঙ্গু হতো না।’
এই হাসপাতালে ১০০ শয্যার একটি স্ট্রোক ইউনিট আছে। ইউনিটটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেখানে কাজ করছেন সহকারী অধ্যাপক সুবীর চন্দ্র দাস। তিনি বলেছেন, স্ট্রোকের রোগী দেরি করে হাসপাতালে আসায় তাদের মধ্যে স্থায়ী পঙ্গুত্বের হার বেড়ে যাচ্ছে। লম্বা সময় ধরে স্ট্রোকের রোগীর দেখভাল করতে গিয়ে সেবাদাতা অসুস্থ হয়ে যান, পরিবারকে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা নিতে হয়। দেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
খুব ভোরে বা রাতে মাঝেমধ্যে কিছু স্ট্রোকের রোগী পাওয়া যায়, যাদের থ্রম্বোলাইসিস ওষুধটি দেওয়া যায় বলে জানিয়েছেন এই চিকিৎসক। এই রোগীরা সাধারণত ধানমন্ডি, আগারগাঁও, শ্যামলী, মিরপুরের বাসিন্দা। কদাচিৎ নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের রোগীও পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরির কারণ নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৮৭ দশমিক ৭২ শতাংশ রোগী স্ট্রোকের লক্ষণ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টা পর হাসপাতালে পৌঁছান। রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে মধ্যম সময় ১৪ ঘণ্টা।
বাংলাদেশের পাঁচটি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে ৪৪৮ জন স্ট্রোকের রোগীর ওপর পরিচালিত এ গবেষণাটি ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যম বিলম্ব ছিল ১৯ দশমিক ৭৫ ঘণ্টা। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে তা ১৫ ঘণ্টা।
২৭ বছরের মোহাম্মদ রফিক স্ট্রোক ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ৩০ অক্টোবর বিকালে স্ট্রোকের পর প্রথমে তাকে স্থানীয় তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেরে রোগীকে উন্নত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর সেদিনেই রাত ৯টার দিকে রফিককে ভর্তি করা হয় শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাতে পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় তাৎক্ষণিক সিটি স্ক্যান করা যায়নি। অপেক্ষা করতে হয় সকাল পর্যন্ত। এরপর সকাল ১০টার দিকে সিটি স্ক্যান করার পর স্ট্রোকের মাত্রা দেখে রোগীকে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রেফার করা হয়। টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে রফিককে রাজধানীর এই হাসপাতালে আনার মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ২৪ ঘণ্টার বেশি।
স্ট্রোক ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর হোসেন বলছেন, রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরানোর পরিবর্তে কোথায় জরুরি সিটি স্ক্যান ও প্রয়োজনীয় স্ট্রোকের চিকিৎসা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাতে দ্রুততম সময়ে সেবা মিলবে।
গবেষণায় বিলম্বের তিনটি পর্যায় চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, রোগীর স্বজনদের চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেরি। তৃতীয়ত, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের কারণে বিলম্ব।
নিউরো বিশেষজ্ঞদের কথা, স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার জন্য ‘বি ফাস্ট’ পদ্ধতিটি মনে রাখতে হবে। বি (ব্যালান্স) ভারসাম্য হারানো, ই (আইস) দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, এফ (ফেস) মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এ (আর্ম) হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, এস (স্পিচ) কথা জড়িয়ে যাওয়া, টি (টাইম) সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো। স্ট্রোকের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত রোগীকে এমন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে স্ট্রোক ইউনিট আছে এবং থ্রম্বোলাইসিস করার সুবিধা রয়েছে। এতে রোগীর পঙ্গুত্ব প্রতিরোধ করা যায়। মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি কমানো যায়। পুরোপুরি সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ বেড়ে যায়।
অধ্যাপক মাহ্মুদুল ইসলাম বলেছেন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং হাসপাতালের উপযুক্ত অবকাঠামো, বিশেষ করে সিটি স্ক্যান সুবিধা থাকলে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও এ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। নিউরোলজিস্টদের পাশাপাশি মেডিসিন বিশেষজ্ঞরাই এ চিকিৎসা দিতে পারবেন।
এই অধ্যাপক আরও বলছেন, স্ট্রোকের পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে ছয় ঘণ্টা বাড়াতে কাজ করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে এ সময় ২৪ ঘণ্টা। এ ছাড়া অদূরে থ্রম্বোলাইসিসের খরচও কিছুটা কমে আসবে। এখন খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মারা যান ৬৭ দশমিক ৪ জন। নারীদের মধ্যে স্ট্রোকে মৃত্যুহার পুরুষদের তুলনায় বেশি।



