রাষ্ট্র সংস্কারে জিয়ার ভূমিকা ও আজকের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি দেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জাতীয় সংহতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নতুন চিন্তা ও প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি, খাদ্যসংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রাষ্ট্রকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচনা হয় নতুন এক অধ্যায়ের।
৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন রয়েছে। তবে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, এর পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসন সচল করা, উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
জিয়ার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালুর পর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম উন্মুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরে পায়। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল ও দর্শনের সূচনা করেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণ সংসদীয় রাজনীতির নতুন পর্বের সূচনা করে।
রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নেও জিয়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা সামনে আনেন। বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অভিন্ন ভিত্তিতে সব নাগরিককে একটি জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল এই দর্শনের মূল কথা। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে জিয়া উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বেসরকারি উদ্যোগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন। স্বাধীনতার পর অর্থনীতির বড় অংশ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছিল। তিনি ব্যক্তি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ, কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির প্রসারে উদ্যোগ নেন। তাঁর বিবেচনায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদেরও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল তাঁর উন্নয়ন দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ১৯ দফা কর্মসূচিতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। তাঁর উন্নয়ন ভাবনায় গ্রামের মানুষ ছিল রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রধান অংশীজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
শিক্ষা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নও তাঁর কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা আর্থিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার যে ধারণা তিনি সামনে আনেন, তা পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
তবে জিয়াউর রহমানের শাসনামল মূল্যায়নে সীমাবদ্ধতাগুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সামরিক আইন, সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত বিতর্ক তাঁর শাসনামলের ইতিহাসের অংশ। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবদান স্বীকার করার অর্থ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। অর্জন ও সীমাবদ্ধতা উভয়কেই ইতিহাসের নিরিখে মূল্যায়ন করাই দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি।
৭ নভেম্বরের তাৎপর্য তাই শুধু জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তাও এই দিনের অন্যতম রাজনৈতিক বার্তা। একটি নবীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নতুন নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন প্রত্যাশা সামনে নিয়ে আসে।
দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে জাতীয় দিবসগুলোর রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও উদ্যাপনের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল করা হয় এবং দিবসটির রাষ্ট্রীয় উদ্যাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়। অথচ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দলের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেই একটি জাতীয় দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করার যুক্তি তৈরি হতে পারে না। ইতিহাসের কোনো অধ্যায় রাজনৈতিক বিরাগ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা উচিত নয়।
এই বাস্তবতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ৭ নভেম্বরের সাধারণ ছুটি পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি শুধু একটি সরকারি ছুটি ফিরিয়ে দেওয়া নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তবে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও গভীর হবে যদি সরকার সব ঐতিহাসিক দিবসের ক্ষেত্রে উদার, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে।
বর্তমান সরকারের সামনে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে বাস্তব রাষ্ট্র সংস্কারের দর্শনে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইন ও সংবিধানই যেন সবার অধিকার নির্ধারণ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরশীলতার দর্শনকে বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর করতে হবে। কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, রপ্তানি ও বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসারের পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা ও প্রকৌশলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, গ্রামীণ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন যেন রাজধানী বা কয়েকটি বড় শহরে সীমাবদ্ধ না থাকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের সম্পদ—এর প্রতিটি টাকার ব্যবহার হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, প্রতিশোধের পরিবর্তে আইনের শাসন এবং বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাতীয় সংহতির অর্থ সবাইকে একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে হবে, এমন নয়। বরং ভিন্নমত ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ যখন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের কল্যাণের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন, তখনই প্রকৃত জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নে তাঁর অবদান ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই ইতিহাসের আলোকে বিবেচনা করতে হবে। তবে তাঁর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির প্রত্যাশা, গ্রামীণ উন্নয়নের দর্শন এবং জাতীয় ঐক্যের আহ্বান সমকালীন বাস্তবতায় নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বিপ্লবের সার্থকতা ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে। জাতীয় সংহতির সার্থকতা আনুষ্ঠানিকতায় নয়, মানুষের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠায়। আর রাষ্ট্র সংস্কারের সার্থকতা নতুন কাঠামো তৈরিতে নয়, সেই কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে তোলায়।
৭ নভেম্বরের প্রকৃত শিক্ষা হোক—রাষ্ট্র সবার, দেশ সবার, স্বাধীনতা সবার এবং উন্নয়নের সুফলও সবার।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়




