ভোটাধিকার নিয়ে ইসির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রবাসীদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটারদের ডাকযোগে বা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুত করা স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত বিধিমালা ও আচরণবিধিতে এ সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইসির যুক্তি, বিদেশে থাকা ভোটারদের কাছে ব্যালট পাঠানো, তা ফেরত আনা, যাচাই এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা জটিল ও ব্যয়বহুল।
তবে ইসির এ সিদ্ধান্ত নিয়ে এরই মধ্যে রাজনৈতিক দল, প্রবাসী ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের বক্তব্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একই নাগরিকদের সেই অধিকার থেকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ভোটের আইনি সুযোগ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় প্রবাসী ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য পোস্টাল ভোটিংয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
ইসির চূড়ান্ত ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন পোস্টাল ভোটার ছিলেন। তাদের মধ্যে ভোট দেন ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন। বাতিল হয় ৫৭ হাজার ৮৯৮ ভোট। প্রদত্ত ভোটের বড় অংশ যায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ঘরে। বিএনপি ও জামায়াত মিলে পায় ৮ লাখ ১০ হাজার ২৫৮ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ৭৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। একক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী পায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট বা ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিএনপি পায় ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট বা ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পায় ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটের সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন জামায়াত ও এনসিপির নেতারা। তাদের বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনে যে পদ্ধতিতে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও তা চালু রাখা সম্ভব।
তবে ইসি বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা হলে ব্যালট প্রেরণ, ফেরত গ্রহণ, যাচাই ও গণনার সময়সীমা নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে এবং এতে ব্যয়ও বাড়বে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ‘প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য নতুন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।’
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নাগরিক দেশে থাকুক কিংবা প্রবাসে, ভোটার হলে তার ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জুলুম ও অবিচার হবে। তিনি বলেছেন, ‘এখন আমরা শুনছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের ভোট মাইনাস করার চিন্তা করা হচ্ছে। এটা যদি হয়, তাদের ওপর জুলুম ও অবিচার করা হবে। আমরা এটা মানব না।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রবাসীদের ভোটাধিকার যেকোনো মূল্যে থাকতে হবে। এটা তাদের নাগরিক অধিকার। একবার দিয়ে এ অধিকার হরণ করা অসাংবিধানিক। আমরা ইসিকে বলব এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে যেন সরে আসে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে দলের সুদৃঢ় অবস্থান জানানো হবে।’ এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাতিল কোনোভাবেই ভালো সিদ্ধান্ত নয়। প্রবাসীদের ভোটাধিকারে কীসের ভয় পাচ্ছে ইসি কিংবা সরকার।’
দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার আগামীর সময়কে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার থাকতে পারলে স্থানীয় নির্বাচনে কেন থাকবে না— এ প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। তার দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের দাবিতে ইসিতে চিঠি দেবে।
সৌদি আরবে অবস্থানরত মাকসুদুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা দেশের বাইরে থাকলেও দেশের নাগরিক এবং নিজ এলাকার ভোটার। জাতীয় নির্বাচনে যদি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন সেই সুযোগ থাকবে না? নির্বাচন কমিশনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলন’। গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর সংগঠনটির সদস্য সচিব আল আমিন আটিয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রবাসী ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত না করা হলে তারা আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলবেন।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে ইসিকে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ লেবার পার্টি। গতকাল বুধবার দুপুরে দলটির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোটের সুযোগ না রাখা যথাযথ হবে না। তারা বাংলাদেশের নাগরিক ও ভোটার। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ড. মাহবুবুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, পোস্টাল ভোট পরিচালনায় জটিলতা ও ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য হলেও এর কারণে প্রবাসী ভোটারদের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বাদ দেওয়া সমাধান নয়। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সহজ ও কার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।



