মৃত্যু বেড়েছে ৭৭% আহত ৩৫১%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘ঈদ মানে আনন্দ’। বহুল প্রচলিত কথাটি অবশ্য সবার বেলায় খাটে না। মুখে ফোটে না ঈদের হাসি। তাদের ঘরে ওঠে লাশের খাটিয়া। চোখের জলে ভেজে আপন আঙিনা। ঈদ মানে যেন মৃত্যুর বোঝা ভারী হওয়ার কারণও। পাঁচ থেকে সাত বছরের ব্যবধানে শুধু ঈদের ছুটির সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে গড়ে ৭৭ শতাংশ। আর আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় গড়ে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫৬ শতাংশ। আহত বাড়ার সংখ্যা আরও বেশি, ৩৫১ শতাংশ।
ঈদের ছুটিতে ঘটা সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য ২০২০ সাল থেকে সংরক্ষণ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাওয়া তথ্যের অঙ্ক কষে দেখা গেছে, ঈদুল আজহার তুলনায় ঈদুল ফিতরে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বেশি।
২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ১ হাজার ৮৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় অন্তত ২ হাজার ৩১ জনের। এসব দুর্ঘটনায় আহত হন কমপক্ষে আরও ৮ হাজার ৩৬৩ জন। প্রথম বছরের সঙ্গে শেষ বছরের তুলনা করলে বেরিয়ে আসে এই সময়ে দুর্ঘটনা ১৯১ শতাংশ, মৃত্যু ১০৩ শতাংশ ও আহত বেড়েছে ৫২৯ শতাংশ।
ঈদুল আজহার হিসাব রাখা শুরু হয় পরের বছর ২০২১ সাল থেকে। তখন থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ১ হাজার ৩৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ১ হাজার ৪১৬ জনের। এতে আহত হয় অন্তত আরও ৩ হাজার ৮১৬ জন। এই সময়ের ব্যবধানে ১২০ শতাংশ দুর্ঘটনা, ৫০ শতাংশ মৃত্যু ও ১৭২ শতাংশ আহত বেড়েছে।
দুর্ঘটনার পেছনে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু কারণ চিহ্নিত। তবু সমাধান বা কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কারণগুলো হলো— ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবাদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
দুর্ঘটনার জন্য চালকের মানসিকতা অন্যতম দায়ী বলে মনে করছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন। তার ভাবনায়, অতিরিক্ত গতি, বেশি ট্রিপ দিয়ে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়কে ছোট গাড়ির আধিক্য, সংযোগ সড়কের যান মহাসড়কে উঠে যাওয়ার ফলেও বাড়ে দুর্ঘটনা। কোরবানির সময় বৃষ্টি ও পশুর হাট বাড়তি করে যুক্ত হয়। বৃষ্টিতে সড়কের খানাখন্দ যায় ডুবে, রাস্তা স্বাভাবিকের তুলনায় থাকে পিচ্ছিল; এতে দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। দুই মাস আগের ঈদের পুরো ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছুটি ছিল তুলনামূলক লম্বা। তাই ঘরমুখী ও ফিরতি যাত্রায় একসঙ্গে চাপ তৈরি হয় কম। যদিও দুর্ঘটনা ছিল না থেমে। রাজবাড়ী ও কুমিল্লার পাশাপাশি সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে ২ মৃত্যু এবং জামালপুরে ভাসমান সেতু উল্টে ৪ শিশু মৃত্যুর বিষয়টি আলোচিত হয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্বস্তিতে ও নিরাপদে বাড়ি ফেরার মতো গণপরিবহনব্যবস্থা নেই দেশে। ফলে মানুষ অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রা করে দুর্ঘটনায় পড়েন। তিনি বললেন, ‘আসলে একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে তিন বছরমেয়াদি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’ পরামর্শ দিলেন, রেলপথে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়কপথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে। এ ছাড়া উন্নত ও জনবান্ধব করতে হবে নৌপরিবহনকে।






