ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ধাক্কা অর্থনীতিতেও
- বিশ্বে বছরে ১১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু
- পদক্ষেপ নিলে ১০ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যু এড়ানো সম্ভব

প্রতীকী ছবি
ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকের মতো অণুজীবের বংশবৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যবহার করা হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ। দীর্ঘদিন এসব অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভাইরাল বা অ্যান্টিফাঙ্গালের মতো ওষুধ যথেচ্ছ ব্যবহারে মানবদেহে কমতে শুরু করেছে কার্যকারিতা। এটি এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে নেই, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও হয়ে উঠেছে বড় হুমকি।
এক গবেষণা বলছে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের (এএমআর) কারণে বৈশ্বিক জিডিপি ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি (১ দশমিক ৬৭ ট্রিলিয়ন) ডলার কমে যেতে পারে। বিপরীতে উন্নত চিকিৎসা, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন, টিকাদান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে সমন্বিত বিনিয়োগ করা গেলে একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৯৯ হাজার (৯৯০ বিলিয়ন) ডলার অতিরিক্ত যোগ হতে পারে।
সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের (সিজিডি) ওয়ার্কিং পেপারে প্রকাশিত ‘মডেলিং দ্য গ্লোবাল ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অব হিউম্যান অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক আমান্ডা এম কান্ট্রিম্যান ও সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাকটেরিয়াজনিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের কারণে বিশ্বে বছরে সরাসরি ১১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ৪৭ লাখ ১০ হাজার মৃত্যুর সঙ্গে এএমআর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে ওষুধপ্রতিরোধী সংক্রমণ শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, বাড়াচ্ছে চিকিৎসা ব্যয়, কমাচ্ছে শ্রমশক্তি ও উৎপাদনশীলতা এবং পর্যটন ও সেবা খাতেও তৈরি করছে নেতিবাচক প্রভাব।
ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) পূর্বাভাসের ভিত্তিতে গবেষণায় পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেখানে উন্নত ব্যাকটেরিয়াল চিকিৎসা, নতুন গ্রাম-নেগেটিভ অ্যান্টিবায়োটিকের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি টিকা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই সমন্বিত হস্তক্ষেপ সফল হলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যু এড়ানো সম্ভব বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ে ৯ হাজার ৮৬২ কোটি ডলার সাশ্রয় হতে পারে। অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়বে। সমন্বিত হস্তক্ষেপের ফলে বৈশ্বিক জিডিপি ২০৩০ সালে ৩৮ হাজার ৬২০ কোটি ডলার, ২০৪০ সালে ৭৮ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার এবং ২০৫০ সালে ৯৮ হাজার ৯৭০ কোটি ডলার বাড়তে পারে। ২০৫০ সালে অর্থনৈতিক কল্যাণ বাড়ার পরিমাণ হতে পারে ২৫ হাজার ৪ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা ১৫ শতাংশ দেশের গতিতে প্রতিরোধ বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। ২০৫০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৬৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়বে ১৭ হাজার ৫৭৪ কোটি ডলার। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জিডিপি কমতে পারে ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির শূন্য দশমিক ৮২৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক কল্যাণ কমতে পারে ৫২ হাজার ২৫৫ কোটি ডলার। এই ক্ষতি আশাবাদী পরিস্থিতিতে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য কল্যাণের দ্বিগুণের বেশি।
গবেষণাটি বলছে, এএমআর প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, নতুন ওষুধের উদ্ভাবন, টিকাদান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে একসঙ্গে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর ফল দিতে পারে। শুধু নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করলেই সংকটের সমাধান হবে না; ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার এবং সংক্রমণ প্রতিরোধকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষকরা মনে করেন, এএমআরবিরোধী উদ্যোগের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা বাস্তবায়ন ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে, গ্রাম-নেগেটিভ অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক লাভের বাস্তবায়ন ব্যয়ের ২৮ গুণ হতে পারে।
এই যখন সার্বিক অবস্থা, তখন অ্যান্টিবায়োটিক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক নিয়েছে। ডায়রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ছিল আজিথ্রোমাইসিন ও মেট্রোনিডাজল।
‘অ্যান্টিবায়োটিক ইউজ ফর ডায়রিয়া অ্যান্ড রেসপিরেটরি ইলনেসেস অ্যামাং চিলড্রেন আন্ডার ফাইভ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের চিত্রের ভয়াবহতা উঠে এসেছে। গবেষণায় ৩ হাজার ২৫ জন শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ৬৮ শতাংশের ক্ষেত্রে স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসা নেওয়া, নিজেরাই ওষুধ দেওয়া অথবা কোনো আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা না নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছে না যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রচলিত অভ্যাস, হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, চিকিৎসাকেন্দ্রের দূরত্ব এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা।
এদিকে বাংলাদেশের জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা দেখতে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ২০ হাজার ৮৬৮টি অ্যান্টিবায়োটিকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ৬১ শতাংশ ওয়ার্ডের রোগী, ২৬ শতাংশ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের রোগী এবং ১৩ শতাংশ বহির্বিভাগের রোগীর তথ্য নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ছিল সেফট্রিয়াক্সোন ৩১ শতাংশ। এরপর ফ্লুক্লক্সাসিলিন ১২ এবং মেরোপেনেম ১১ শতাংশ। বহির্বিভাগে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সিপ্রোফ্লক্সাসিন ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মু. মনজুরুল করিম আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ব্যাকটেরিয়ার ধরন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকেরও ভিন্নতা রয়েছে। ফলে কোন রোগীর জন্য কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি।’
রক্তের কালচারসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরই বোঝা সম্ভব যে রোগীর জন্য কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন কিংবা আদৌ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন আছে কি না। আবার অনেক রোগ ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় না। ভাইরাসজনিত রোগের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। তাই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়, মত এই বিশেষজ্ঞের। মেরোপেনেম ও সেফট্রিয়াক্সোনের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, মেরোপেনেমকে শেষ ভরসার অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগের অনেক অ্যান্টিবায়োটিক যখন কাজ করে না, তখন চিকিৎসকদের হাতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর একটি হলো মেরোপেনেম। তবে বর্তমানে যে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে, ভবিষ্যতে সেটিও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ডাক্তারদের হাতে আর কোনো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আবু জামিল ফয়সাল আগামীর সময়কে বললেন, ‘শুধু মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত ব্যবহারকে দায়ী করলে চলবে না। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, পোলট্রি ও গবাদিপশুর খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাণীদের চিকিৎসায় এর অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগও এএমআর তৈরির অন্যতম কারণ। এসব প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হয়ে খাদ্য, পানি ও পরিবেশের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক না খেলেও মানুষ প্রতিরোধী জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারে।’
তাই এএমআর মোকাবিলায় শুধু মানুষের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলেও উল্লেখ করলেন তিনি।





