ঈদের বাসে ১৬৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভাড়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঈদ মানে আনন্দ, দুঃখ, দুর্ভোগ, স্বস্তি- সময়ভেদে নিশ্চিত না হলেও যাত্রাপথে অতিরিক্ত ভাড়া যেন পুরোপুরি নিশ্চিত ঘটনা। এবারের ঈদেও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ১৬৭ কোটি টাকার মতো বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ঈদের বাসে।
সারা দেশে মোট ৮০০টি রুটে (বাস চলাচলের নির্দিষ্ট পথ) নিয়মিত বাস চলাচল করে। এর মধ্যে ২৭টি রুট বাছাই করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হয়। এতে ৯৮ লাখ ট্রিপ যাত্রীর মধ্যে ২ লাখ ৩৪ হাজার যাত্রীর একটি হিসাব করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা ঘটেছে।
তবে বাইরে থাকা আরও ৭৩৭টি রুট পরীক্ষা করা হয়নি। যদিও ২৭ রুটের ছবি বাকি রুটগুলোতেও গড় অঙ্কে ফেলে হিসাব করলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় দাঁড়ায় ১৬৬ কোটি ৪৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০ টাকা।
আগামীর সময়ের জন্য এই পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ জরিপ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এটি তৈরি করতে সমিতির পক্ষ থেকে 'গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য উপকমিটি' করা হয়।
সমিতির গণপরিবহন ভাড়া মনিটরিং কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দূরপাল্লার রুটগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-খুলনা ও চট্টগ্রাম-গাইবান্ধা রুটে যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট যেখানে নির্ধারিত ভাড়া ৫৫২ টাকা, সেখানে আদায় করা হচ্ছে ৮০০ টাকা। সম্ভাব্য যাত্রী ৬০ হাজার হলে ২৪৮ টাকা করে মোট ১ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় হয়েছে। ঢাকা-খুলনা রুটে ৫৪১ টাকা নির্ধারিত ভাড়া হলেও আদায় করা হয়েছে হাজার টাকা। এই পথে ১০ হাজার যাত্রী অন্তত ৪৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-গাইবান্ধা রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দিগুণ ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এই পথের সম্ভাব্য ৩ হাজার যাত্রী ১ হাজার ১০০ টাকার ভাড়া ২ হাজার ২০০ টাকা করে দিয়েছেন। যাত্রী কম হওয়ার এই পথে অতিরিক্ত ভাড়া টাকা মোট অঙ্কে কম। তবে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া টাকায় বেশি। আর সবচেয়ে কম অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে সায়েদাবাদ-কুষ্টিয়া রুটে। নির্ধারিত ৭৫০ টাকার জায়গায় যাত্রীদের কাছ থেকে ৮০০ টাকা করে নেওয়ায় হয়েছে।
এ ছাড়া কমিটির পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের তথ্যশূন্য দেখানো হয়েছে। যদিও কয়েকটি রুটে নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে।
যেমন— চট্টগ্রাম-বগুড়া- ১ হাজার ১৯৭ টাকার জায়গায় ১ হাজার ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-কিশোরগঞ্জ- ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৯০০ টাকা, ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা- ৬৫০ টাকার ভাড়া ঠেকেছে হাজার টাকায়, ঢাকা-ফেনী- ৪৪০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা নেওয়া হয়।
আবার বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলগামী রুটগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের একাধিক অভিযোগ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলগামী কয়েকটি রুটে অতিরিক্ত ভাড়ার পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও যাত্রীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মোট আদায়ের অঙ্ক বড় হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদের আগে বাস সংকট, অতিরিক্ত চাহিদা এবং অগ্রিম টিকিটের অজুহাতে পরিবহন মালিক ও কাউন্টারগুলো বাড়তি ভাড়া আদায় করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শনও করা হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ বলছেন, 'অতিরিক্ত ভাড়া যে একেবারেই নেওয়া হচ্ছে না, তা বলব না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেওয়া হতে পারে। সব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। গতকাল আমরা দুটি বাস ধরে জরিমানা করিয়ে দিয়েছি।'
'যদি কারও কাছে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রমাণ থাকে তাকে বলব অভিযোগ করতে। স্পটে স্পটে পুলিশ, প্রশাসনসহ আমরা আছি। তাদের নামে মামলা হবে', যোগ করেন তিনি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, বাস ও সরকারপক্ষের কেউই কথা রাখছেন না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা চলমান রেখে ঈদযাত্রাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করা হচ্ছে।






