ডেঙ্গু সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী, বাড়ছে মৃত্যু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্ষা মৌসুম আসতেই বাড়ছে ডেঙ্গুঝুঁকি। রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এ নিয়ে চলতি মাসে মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়াল সাতে। এরমধ্যে চলতি সপ্তাহেই মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। এর আগে গত মে মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল একজনের। আর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মারা গেছেন ১২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩১৭ জন। এরমধ্যে জুন মাসেই ২১২০ জন, যা আগের মাসের তুলনায় তিনগুণ। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৫৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা, একজন করে বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগের। আর একজন ঢাকায় মারা গেলেও এখানকার বাসিন্দা নন তিনি।
এ বছর বৃষ্টি বেশি হচ্ছে, ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বেশি থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, সামাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে বাড়বে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, ‘বর্ষা মৌসুমে মশার প্রজনন বেশি থাকে। পাশাপাশি বর্ষাকাল প্রলম্বিত হলে বেড়ে যায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি। এ বছর বৃষ্টি বেশি হচ্ছে, ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বেশি থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, সামাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে বাড়বে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।
গত মঙ্গলবার জ্বরে আক্রান্ত হয় ছয় বছরের নাজিয়া রহমান। জ্বরের মাত্রা বেশি না হলেও আতঙ্কিত বাবা-মা। জ্বর আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেয়েকে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান তারা। সাধারণ জ্বর ধারণা করে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না দিয়ে শুধু ওষুধ দেন চিকিৎসক।
নাজিয়ার বাবা মজিবর রহমান মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। তিনি বলেছেন, ‘আগে জ্বর এলে তিন দিন পর্যন্ত দেখে চিকিৎসকের কাছে যেতাম। এখন প্রথম দিনেই ভয় পেয়ে যাই। মনে হয় ডেঙ্গু নাকি হাম বা না আবার কী? তাই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেছেন, রোগের ধরন পাল্টাচ্ছে। নানান রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। আগে জ্বর এলে তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ ছিল। এখন এই অবস্থা নেই। অনেক রোগীকে লক্ষণ দেখে প্রথম দিনেই ডেঙ্গুর পরীক্ষা করাতে দিতে হয়। এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সরকার অনুমোদিত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনোভাবেই নিজে নিজে বা দালালদের মাধ্যমে নিবন্ধনহীন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাবে না
তবে আতঙ্কিত না হয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করার কথা জানালেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি বলছিলেন, প্রথমত, মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। প্রত্যেকের বাসায় যত ধরনের পানির পাত্র আছে, তা পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারকে মশা ও লার্ভা ধ্বংস করতে কার্যকর রাসায়নিক নিয়মিতভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সরকার অনুমোদিত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনোভাবেই নিজে নিজে বা দালালদের মাধ্যমে নিবন্ধনহীন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাবে না।
সারা দেশে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি আজ বুধবার বাসাবাড়িতে এডিস মশা অনুসন্ধান ও লার্ভা ধ্বংস করার অভিযান পরিচালনা করেছে। এর অংশ হিসেবে অভিযান কার্যক্রম চালানো হয় গুলশান ২ নম্বরে কয়েকটি স্থাপনায়। অভিযানকালে উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা আক্তার নেলী ১০৭ নম্বর রোডের চয়েজ রেস্তোরাঁর মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাসের জন্য কারাদণ্ড দেন।
কার্যক্রম পরিদর্শনকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু মশা নিধনের লক্ষ্যে জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনাসহ মনিটরিং কার্যক্রম চালাবে এবং অব্যাহত থাকবে এই কার্যক্রম।’
লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধে সচেতনতামূলক মাইকিং, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ করা হয় অভিযান চলাকালে।





