দেশেই বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার অঙ্গীকার

ইউনিকো হাসপাতালের সিইও আর্দ্রা কুরিয়েন
প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক এবং মানবিক সেবা— এই তিনের সমন্বয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন মডেল নিয়ে গড়ে উঠেছে ইউনিকো হাসপাতাল। ধানমন্ডির এই হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন সিইও আর্দ্রা কুরিয়েন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাউসার আহমেদ
আগামীর সময়: একটি নতুন হাসপাতাল হিসেবে রোগীদের আস্থা অর্জনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আর্দ্রা কুরিয়েন: বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের বিশ্বাস অর্জন। আধুনিক ভবন বা উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই মানুষ আসে না; তারা দেখতে চায় চিকিৎসার মান, সেবার আন্তরিকতা এবং স্বচ্ছতা। আমরা শুরু থেকে রোগীর সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে আইসিইউ বা জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে আমাদের মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম রোগীর পরিবারের সদস্যদের প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে বলে এবং সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। আমরা চাই, রোগী শুধু চিকিৎসা নয়, সম্মান ও আস্থাও অনুভব করুক। এই বিশ্বাস অর্জনই আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
আগামীর সময়: স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগের জন্য ইউনিকো কেন বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে?
আর্দ্রা কুরিয়েন: এখানকার চিকিৎসকদের দক্ষতা, মানসম্মত চিকিৎসার চাহিদা এবং স্বাস্থ্য খাতের সম্ভাবনা আমাদের আকৃষ্ট করেছে। ইউনিকো হাসপাতালটি বাংলাদেশি চিকিৎসক ও উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। ভারতের কেরালার রাজাগিরি হাসপাতাল টেকনিক্যাল পার্টনার হিসেবে প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনা সহায়তা দিচ্ছে। তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল হাসপাতাল পরিচালনা, নার্সিং, অপারেশন থিয়েটার এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীই বাংলাদেশি। আমাদের লক্ষ্য বিদেশি অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদকে একত্র করে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা।
আগামীর সময়: ইউনিকো কীভাবে মানসম্মত সেবা ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখছে?
আর্দ্রা কুরিয়েন: স্বাস্থ্যসেবা সব দেশেই ব্যয়বহুল। তবে আমরা এটিকে মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছি। ইউনিকো একটি মিড-সেগমেন্ট হাসপাতাল হিসেবে কাজ করছে।
আমরা কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন ব্রিজ ফান্ড। এর মাধ্যমে কোনো রোগী সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করতে না পারলে হাসপাতালের পরিচালক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদানে গঠিত এই তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। রোগী যতটুকু সক্ষম, ততটুকু পরিশোধ করেন; বাকি অংশ ফান্ড থেকে বহন করা হয়। রয়েছে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। যেখানে প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার নির্দিষ্ট কিছু সেবায় ও চিকিৎসক ফিতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সিনিয়র সিটিজেন কেয়ারে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বিশেষ ছাড় ও ভর্তুকির ব্যবস্থাও রয়েছে।
আগামীর সময়: সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ইউনিকোতে কী কোনো বিনামূল্যের সেবা রয়েছে?
আর্দ্রা কুরিয়েন: অবশ্যই রয়েছে। আমরা হাসপাতাল চালুর প্রথম মাস থেকেই কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রতি মাসে অন্তত দুটি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়, যেখানে সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া রিকশাচালকদের জন্য একটি বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি চালু করেছি। তারা বিনামূল্যে রক্তচাপ ও রক্তে সুগার পরীক্ষা করাতে পারেন এবং একজন সিনিয়র এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের কাছ থেকে বিনামূল্যে পরামর্শ পান। তাদের একটি স্বাস্থ্য রেকর্ড কার্ড দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে নিয়মিত ফলোআপ করা হয়। এরই মধ্যে একটি কর্মসূচিতে ৩০০-এর বেশি রিকশাচালক অংশ নিয়েছেন। অনেকে প্রথমবারের মতো জানতে পেরেছেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে।
আগামীর সময়: সর্বনিম্ন কত টাকার মধ্যে একজন রোগী ইউনিকো থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন?
আর্দ্রা কুরিয়েন: এটি নির্ভর করে তিনি কী ধরনের সেবা নিতে আসছেন তার ওপর। তবে আমরা এমনভাবে সেবার মূল্য নির্ধারণ করেছি, যাতে মধ্যবিত্তরা সহজেই চিকিৎসা নিতে পারেন। বিশেষ দিনগুলোয় ভর্তুকিযুক্ত কনসালটেশন ফি রয়েছে। এ ছাড়া অনেক কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
আগামীর সময়: চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে ইউনিকোর পরিকল্পনা কী?
আর্দ্রা কুরিয়েন: ইউনিকো শুরু থেকে ডিজিটাল হাসপাতাল গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে উন্নত হাসপাতাল তথ্যব্যবস্থা, ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড এবং রোগী ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করছি। ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক এআইভিত্তিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল রিপোর্টিং এবং আরও উন্নত টেলিমেডিসিন সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তি কখনো চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং এটি চিকিৎসকদের আরও দক্ষ ও নির্ভুলভাবে কাজ করতে সহায়তা করবে।
আগামীর সময়: বিদেশফেরত রোগীদের জন্য বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
আর্দ্রা কুরিয়েন: বিদেশফেরত রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ইউনিট নেই। তবে যারা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা অন্য দেশে চিকিৎসা নিয়েছেন কিংবা বিদেশে কর্মরত অবস্থায় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে, তারা এখানে ফলোআপ বা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিতে পারেন। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি এখন ইউনিকোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এমনও আছে, থাইল্যান্ডে কর্মরত একজন রোগী তার অস্ত্রোপচারের জন্য ইউনিকোকে বেছে নিয়েছেন, কারণ এখানে আন্তর্জাতিক মানের সেবা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যায়।
আগামীর সময়: আগামী পাঁচ বছরে ইউনিকোকে কোথায় দেখতে চান?
আর্দ্রা কুরিয়েন: আগামী পাঁচ বছরে আমরা ইউনিকোকে বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত এবং রোগীকেন্দ্রিক হাসপাতাল হিসেবে দেখতে চাই। আমরা শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, সেবার মান, রোগীর অভিজ্ঞতা এবং মানবিক আচরণের জন্য পরিচিত হতে চাই। একই সঙ্গে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনিক্যাল সেবাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামীর সময়: একজন রোগী কেন অন্য কোনো হাসপাতালের পরিবর্তে ইউনিকো বেছে নেবেন?
আর্দ্রা কুরিয়েন: কারণ আমরা শুধু রোগের চিকিৎসা করি না, রোগীরও যত্ন নিই। আমাদের শক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, দক্ষ বাংলাদেশি চিকিৎসক, উন্নত প্রযুক্তি এবং মানবিক সেবা। আমরা রোগী ও তার পরিবারের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ করি, চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ ব্যাখ্যা করি এবং প্রয়োজনীয় সময় দিই।
আগামীর সময়: একজন সাধারণ রোগীর জন্য আপনার বার্তা কী হবে?
আর্দ্রা কুরিয়েন: অসুস্থতা জটিল হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। স্বাস্থ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ।




