দেশ যখন ছুটিতে মৃত্যু তখন শিয়রে
হামে ৫৭

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ছয় নবজাতকের কেউই এভাবে কোলে চড়তে চায়নি - আগামীর সময়
কোরবানির ঈদের আগের দিন সাধারণত এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয় চারপাশে। শহরের বাজারগুলোতে শেষ মুহূর্তের ভিড়, কসাই ঠিক করার তাড়াহুড়া, ফর্দ মিলিয়ে কেনাকাটা, আর ঘরে ঘরে রান্নার প্রস্তুতি— সব মিলিয়ে এক ধরনের ব্যস্ত আনন্দের পরিবেশ। কেউ প্লেট-হাঁড়ি গুছিয়ে রাখেন, কেউ মাংস ভাগাভাগির পরিকল্পনা করেন, আবার কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের দিনের আড্ডার অপেক্ষায় থাকেন।
কিন্তু এবারের ঈদ যেন সেই চেনা আনন্দের গল্পকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। উৎসবের এ সময়েই একের পর এক শিশুমৃত্যুর খবর দেশের মানুষের মনে আনন্দের বদলে বেদনার সুর এনে দিয়েছে। কোথাও হাসপাতালে সন্তানকে বাঁচানোর জন্য অভিভাবকদের অসহায় অপেক্ষা, কোথাও আবার হঠাৎ মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়া পরিবার— সব মিলিয়ে ঈদের দিনগুলো অনেকের জন্য পরিণত হয়েছে শোকের সময় হিসেবে।
ঈদের মাঝেই হাসপাতালের ভয়াবহ ঘটনা: গত বুধবার রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে এই মৃত্যু ঘটতে পারে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি।
ঘটনার সময় ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা-ও চিকিৎসাধীন ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তাদের আরও অভিযোগ, শিশুদের কান্নাকাটি ও অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তখন নার্সদের বারবার ডাকা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় শুধু একটি হাসপাতাল নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘নিয়মিতভাবে হাসপাতালের সবকিছু পরীক্ষা করা হলে, চিকিৎসা প্রটোকল ঠিকভাবে মানা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়।’ তার মতে, অনেক সময় কাঠামোগত তদারকির অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে তদন্ত কমিটি অতিরিক্ত তিন দিন সময় চাইলে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ৩ জুন ঠিক করা হয়। এ ঘটনার পর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, আরও তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। ৩ জুন দেওয়া হবে প্রতিবেদন। কারণ সেখানে অবস্থানরত সন্তানহারা মায়েদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, এক মায়ের অনুরোধে দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল এসি এবং সেটা রাত ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত, এ সময় কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। প্রতিবেদনের আলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তকারীরা হাসপাতালের সব বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে— সবকিছুই বের হয়ে আসবে বলেও আশ্বস্ত করেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
এর মধ্যেই গতকাল রবিবার হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিকালে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সেখানে অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন সদস্যের ম্যাজিস্ট্রেট দল। অভিযানের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ মিটার না থাকা, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে রোগীদের খাবার পরিবেশন এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে হাসপাতালটিকে এই জরিমানা করা হয়।
হামে শিশুমৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র: শুধু হাসপাতালের এই ঘটনা নয়। ঈদের ছুটিতে দেশ জুড়ে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির সাত দিনে (২৫ মে-৩১ মে) হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৭ শিশু। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৫৫০ জন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, মার্চ মাস থেকেই হামে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং গত মাসে তা ছিল সবচেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৫ জনে, যার মধ্যে ৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯ হাজার ৯৮৫ জন।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়— প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভেঙে যাওয়া ঈদ, আর একটি থেমে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
মাস তিনেক আগে মা হওয়া রাজধানী বাড্ডার বাসিন্দা হুমাইসা রহমান বলেছেন, ‘প্রতিদিনই অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। হামের ভয়ে আমি ছেলেকে নিয়ে ঘর থেকে বের হই না। অনলাইনে ঈদের কেনাকাটা করেছি। কিন্তু আদ্-দ্বীনের শিশুদের মৃত্যুর খবর সব কষ্ট ছাপিয়ে গেছে।’
তার কথায় ফুটে ওঠে এক ধরনের আতঙ্ক— যেখানে ঈদের আনন্দের চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চিন্তা।
হাসপাতালেই ঈদ কাটানো এক বাবার গল্প: ঈদের দিন পরিবারের থেকে দূরে কাটিয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী বারেক ইসলাম। তার দুই বছরের ছেলে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ছিল রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে।
গাজীপুরের এই ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘কখন কী হয় বুঝতে পারি না। ছেলেকে নিয়ে সবসময় ভয় কাজ করে। এর মধ্যে কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর শুনলে ভয় আরও বেড়ে যায়। ঈদ কীভাবে গেল, বুঝতেই পারিনি।’
এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে ঈদের আসল চিত্র— যেখানে উৎসবের বদলে হাসপাতালের করিডর হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের অস্থায়ী ঠিকানা।
কোরবানির দিনেও পৃথক দুর্ঘটনা: এদিকে কোরবানির দিন আরও দুটি ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জামালপুরের ইসলামপুরে ১৪ বছরের ইয়াসিন হোসেন এবং চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ১১ বছরের আঁখিতারা খাতুন গলায় মাংস আটকে মারা যায়।
চিকিৎসকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ‘হাইমলিখ ম্যানুভার’ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে অনেক সময় জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। কিন্তু সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ায় হাসপাতালে যাওয়ার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় প্রশ্ন: একদিকে হাসপাতালে অস্বাভাবিক মৃত্যু, অন্যদিকে সংক্রামক রোগে শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধি— সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি দুর্বল।
মুশতাক হোসেনের মতে, হামের মতো রোগে শিশুরা বেশি আক্রান্ত ও মারা েগলেও বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। ফলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সময়মতো কার্যকর হয় না।
এ বছরের ঈদ তাই অনেক পরিবারের জন্য শুধু উৎসব ছিল না। কোথাও তা ছিল হাসপাতালের বিছানায় বসে থাকা এক অসহায় অভিভাবকের দীর্ঘ রাত, কোথাও আবার সন্তানের মৃত্যুর খবরে থেমে যাওয়া আনন্দের গল্প।
যে ঈদে মানুষ হাসি, আনন্দ আর মিলনের গল্প খোঁজে, সেই ঈদের মাঝেই এবার মিশে গেছে শোক, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটাই— প্রতিবারই কি উৎসবের সময় আমাদের এমন বেদনার খবর শুনতে হবে, নাকি এক দিন সত্যিই নিরাপদ জীবনের গল্প লেখা শুরু হবে?






