গুরুবিদ্যা
গৌতম ঘোষের মাস্টারক্লাস
- গৌতম ঘোষ। ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্রকার। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই নির্মাতা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষায়, এমনকি বাংলাদেশেও সিনেমা বানিয়েছেন। আগামীকাল তার জন্মদিন। রুদ্র আরিফকে জানিয়েছেন তার চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা

পদ্মা নদীর মাঝি। চলচ্চিত্রকার: গৌতম ঘোষ
চিত্রনাট্যের প্রস্তুতি
স্বাধীন চিত্রনাট্য কিংবা সাহিত্যভিত্তিক রচনা— যা-ই হোক, আমি প্রথমে মূল উপাদানগুলো লিখে নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। এসব উপাদান থেকে সিনেমাটিক কোয়ালিটি ঠিক করে নিই। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র কথা যদি বলি, এটি কমলকুমার মজুমদারের ‘মহাযাত্রা’ উপন্যাস থেকে বানানো। একে সিনেমায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে খুব সাবধান ছিলাম। কারণ কমলকুমার যে শব্দ প্রয়োগ ও বাক্য রচনা করেছেন, যেসব বর্ণনা বা সংলাপ রয়েছে উপন্যাসটিতে, সেগুলোকে চলচ্চিত্রটিতে কোনো কোনো সময় আমি আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সবসময় সেটি সম্ভব নয়। কারণ, সাহিত্যের চিত্রকল্প আর সিনেমার চিত্রকল্পের মধ্যে অনেক তফাত। ফলে আমি যখন কোনো সাহিত্য কিংবা স্বাধীন আইডিয়া থেকে চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা নিচ্ছি— কীভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করব, তা নিয়ে ভাবতে হয়। সেটি লিনিয়ার হতে পারে, নন-লিনিয়ারও।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ হিন্দিতে বানালে হতো না। কারণ, এটি বাংলার নদী, বাংলার মাটি, বাংলার মাঝি— এদের গল্প
শট ডিভিশন ও অভিনেতার স্বাচ্ছন্দ্য
প্রথম দিকের কয়েকটি ছবি ছাড়া আমি কিন্তু সব চিত্রনাট্যই শট ওয়াইজ লিখি। মানে প্রতিটি শট পরপর লেখা এবং কোথায় কাট হবে— সেটিও বোঝা যায়। তাই বলে আমি রক্ষণশীল নই যে, ওটা নিয়েই কাজ করতে হবে। বরং প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করি।
সাধারণত লো বাজেটে ছবি করি বলে আমি জানি, কোন শট কতটুকু রাখতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার পর নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে— একটা লম্বা মাস্টারশট নিলে পুরো দৃশ্য হয়ে গেল। এরপর আবার ক্লোজআপ নেওয়া। কিন্তু আমি তা মনে করি না। আমার কাছে প্রতিটি শটই মাস্টারশট এবং সেখানে চলচ্চিত্রকারের রিদম তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় মনে হয়, যে অভিনেতা কাজ করছেন, আমি যেভাবে লিখেছি, তিনি বোধ হয় তাতে স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন না। এমনটা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই পরিচালককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কীভাবে শট নিলে কিংবা সংলাপ একটু পাল্টে দিলে তিনি স্বচ্ছন্দ হবেন। কারণ, অভিনেতা যদি স্বচ্ছন্দ না হন, তিনি যদি চরিত্র না হয়ে ওঠেন, তাহলে তার কাছ থেকে অভিনয় বের করে নেওয়া পরিচালকের জন্য সমস্যা হয়ে যাবে।
একজন চলচ্চিত্রকারকে প্রতিটি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণকে নতুন করে উদ্ভাবন করতে হবে
প্রযুক্তির বিবর্তন ও ভারসাম্য
আমি দীর্ঘদিন সেলুলয়েডে কাজ করেছি। আমার লাস্ট সেলুলয়েডের সিনেমা ‘মনের মানুষ’। তারপর তো ডিজিটালে করতেই হচ্ছে। কারণ, সেলুলয়েড প্রায় বন্ধ। একজন চলচ্চিত্রকারকে প্রতিটি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণকে নতুন করে উদ্ভাবন করতে হবে। অন্যদিকে, নতুন টেকনোলজি নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু গিমিক হয়ে যাবে। ফলে নতুন কিছু এলে সেটি কীভাবে ব্যবহার করব, সেই পরিমিতি বোধ একজন চলচ্চিত্রের নির্মাতার জন্য জরুরি।
বাংলাদেশে যে ছবিগুলো বানিয়েছি— ‘মনের মানুষ’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ কিংবা ‘শঙ্খচিল’— প্রতিটি জায়গা আগে থেকেই ঘুরে ঘুরে দেখেছি এবং ছবি তুলে এনেছি
এখন তো আবার এআই এসেছে। একে নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এআইকে প্রপারলি প্রম্পট করলে সে ভালো কাজ দেবে। তাই কোনো কিছুই ফেলনা নয়। অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে কিংবা নতুন টেকনোলজি নিয়ে কী করব— এমন দ্বিধা যাদের, তাদের বলি, সবসময় একটা সমন্বয় সাধন করা উচিত।
চরিত্রের ভাষা ও লোকেশন বাছাই
কোনো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যদি সেটির ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক গভীর সম্পর্ক থাকে, তাহলে সেটি সেই ভাষায় না করলে হয় না। যেমন— ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ হিন্দিতে বানালে হতো না। কারণ, এটি বাংলার নদী, বাংলার মাটি, বাংলার মাঝি— এদের গল্প। আমি প্রথম কাহিনিচিত্র (‘মা ভূমি’) তেলেগু ভাষায় বানিয়েছিলাম; কারণ তখন মনে হয়েছিল, এ ক্ষেত্রে ওই ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রথমে স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম ইংরেজিতে। তারপর সহ-লেখককে সঙ্গে নিয়ে তেলেঙ্গানা অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামে শামিল লোকদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, এই স্ক্রিপ্ট কিছু হয়নি; ছিঁড়ে-ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। স্থানীয়রা তেলেগু ভাষা তো জানতেনই, পাশাপাশি ইংরেজি বা হিন্দিতেও কমিউনিকেট করতে পারতেন, তখন তারা সাহায্য করলেন। খুব ভালো লোকজন পেলে ভাষা নিয়ে কোনো অসুবিধা হয় না। আমার লাস্ট ছবিটা (‘পরিক্রমা’) তো তিনটি ভাষায় করেছি— ইতালিয়ান, ইংরেজি ও হিন্দি। কারণ, চিত্রনাট্যের ধারাটাই এমন ছিল। ফলে যে অঞ্চল নিয়ে ছবি করছি, সেই অঞ্চলের কথাবার্তার মধ্যে যে অনুষঙ্গ থাকে, সেগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় ফিল্মমেকার ভাবেন, ‘আমি যেটি জানি, তার চেয়ে বেশি কেউ জানে না।’ এটি ভুল ধারণা। প্রচুর মানুষ আছেন, যারা জানেন, তারা সাহায্য করতে পারেন। কারণ, সিনেমা একদিক থেকে যেমন একজন ইন্ডিভিজ্যুয়াল ফিল্মমেকারের একটি অভিব্যক্তি, পাশাপাশি কিন্তু কালেক্টিভ আর্ট। বহু মানুষ মিলে তৈরি করে।
আমি যত ছবি করেছি, প্রতিটি লোকেশন আগে থেকে ঠিক করে তারপর মাঠে নেমেছি। এমনকি ফাইনাল স্ক্রিপ্ট লেখার আগে অনেক লোকেশনে ঘুরেছি। তাতে ভিজ্যুয়াল বা প্রেক্ষাপট আমার চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। জেনে গেছি, কোথায় কী করতে হবে। বাংলাদেশে যে ছবিগুলো বানিয়েছি— ‘মনের মানুষ’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ কিংবা ‘শঙ্খচিল’— প্রতিটি জায়গা আগে থেকেই ঘুরে ঘুরে দেখেছি এবং ছবি তুলে এনেছি। সুনামগঞ্জ বা টাঙ্গুয়ার হাওর বর্ষাকালে একেবারে সমুদ্রের মতো, শীতকালে তার একদম অন্যরূপ। ফলে কোন ঋতুতে তার কী চেহারা দাঁড়াবে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে আমরা মানিকগঞ্জের একই গ্রামে বিভিন্ন ঋতুতে শুটিং করেছিলাম বলে কখনো বিশাল বটগাছটা জলের তলায়, কখনো সেটি আবার শুকনো ডাঙায় দাঁড়িয়ে আছে। তার একটা আশ্চর্য মজা; মানে নদী পরিবর্তন হয়েছে। এগুলো একটু চিন্তাভাবনা করে ঠিক করা উচিত। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র ক্ষেত্রে আমরা জোয়ার-ভাটা খুব ভালোভাবে হিসাব করেছিলাম। কখন জোয়ার আসবে, কখন ভাটা হবে— সেটির সঙ্গে আমাদের শট প্ল্যানিং বা শিল্পনির্দেশককে যেগুলো কাজ করতে হয়, সেগুলোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মোদ্দাকথা, ভালোভাবে একটা সিনেমা করতে গেলে অধ্যয়ন করতে এবং খাটতে হবে।
গৌতম ঘোষের পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র
চলচ্চিত্রের নাম: ‘মা ভূমি’, ভাষা: তেলেগু, মুক্তি: ১৯৭৯। ‘দখল’, বাংলা, ১৯৮২। ‘পার’, হিন্দি, ১৯৮৪। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, বাংলা, ১৯৮৭। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, বাংলা, ১৯৯২। ‘পতাং’, হিন্দি, ১৯৯৩। ‘গুড়িয়া’, হিন্দি, ১৯৯৭। ‘দেখা’, বাংলা, ২০০১। ‘আবার অরণ্যে’, বাংলা, ২০০৩। ‘ইয়াত্রা’, হিন্দি, ২০০৬। ‘কালবেলা’, বাংলা, ২০০৯। ‘মনের মানুষ’, বাংলা, ২০১০। ‘শূন্য অঙ্ক’, বাংলা, ২০১৩। ‘শঙ্খচিল’, বাংলা, ২০১৬। ‘রাহগির’, হিন্দি, ২০২২। ‘পরিক্রমা’; ইংরেজি, হিন্দি ও ইতালিয়ান; ২০২৫।






