তালিকা বদল, কমিটি বদল, বদলাবে কি ওষুধের দাম?

সংগৃহীত ছবি
নিয়মিত ডাল-ভাত না জুটলেও দেশের অনেক মানুষকে বাধ্য হয়ে কিনতে হয় ওষুধ। রোগব্যাধি অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে আসে না, তাই বিপাকে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা। অসুস্থ হলেই যেতে হয় হাসপাতালে। সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র পেলেও নষ্ট থাকে পরীক্ষার যন্ত্র, মেলে না বিনামূল্যে ওষুধ। অনেক সময় বাইরে থেকে কিনতে হয় সামান্য ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ ও গজকাপড়ও। এরই মধ্যে দফায় দফায় বাড়ছে দাওয়াইয়ের দাম। শুধু কি তা-ই? শখানেক টাকা ঘুষ না দিলে একটি স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারও মেলা ভার।
এসব অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং ওষুধের বাজারে নৈরাজ্য দেখার কি কেউ নেই? সরকার বলছে— আছে।
বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয় জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ। কিন্তু সেই পরিষদই ছিল না বিগত ১০ বছর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কমিটি হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু কমিটি গঠনের আগেই শেষ হয় মেয়াদ। তবে বিনামূল্যে বিতরণ বা কম দামে বাজারে সরবরাহের জন্য অতি জরুরি ১১৭ ওষুধের তালিকা করেছিল ওই সরকার।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ টাকা স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ৪৪ টাকাই যায় ওষুধে। আর এই পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে দারিদ্র্যে নেমেছে ৬১ লাখের বেশি মানুষ। এমন বাস্তবতায় এক দশক পর অতি জরুরি ওষুধের তালিকা হালনাগাদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে সভাপতি করে গঠন হয়েছে নতুন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ। সরকারের দাবি, এতে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়ার সঙ্গে কমবে চিকিৎসা ব্যয়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে— তালিকা ও কমিটি বদলালেই কি সত্যিই কমে ওষুধের দর? আগের হিসাব বলছে, না। বরং, ২০১৬ সালে কমিটি গঠনের পর উল্টো বেড়েছিল মূল্য। তাই কার্যকর বাস্তবায়ন ও বাজার তদারকি ছাড়া শুধু তালিকা বা কমিটি বদলালেই কমবে না সাধারণ মানুষের ওষুধের ব্যয়— মত দিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের তালিকা বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাঁচ মাস পর গত ২২ জুন নতুন করে ২২ সদস্যের জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে বর্তমান সরকার। সেটিও বদল হয়েছে। গেজেট বাতিল করে গতকাল বৃহস্পতিবার কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৪। নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের— তথ্য দিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র।
সদ্য জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ওষুধনীতি তৈরি করে বাস্তবায়ন, ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণে সরকারকে পরামর্শ দেবে এ পরিষদ।
জানা যায়, সর্বশেষ জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হয় ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ওষুধের সংখ্যা ১১৭ থেকে বাড়িয়ে ২৯৫ করা হয়। এর আগে তালিকাটি সর্বশেষ সংশোধন হয়েছিল ২০১৬ সালে। তখন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, সংক্রমণ, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন রোগের প্রয়োজনীয় ওষুধ। সরকারের লক্ষ্য, দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা। এখন নতুন করে তালিকা হালনাগাদের পাশাপাশি ওষুধের মূল্য, প্রাপ্যতা ও নীতিগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে কমিটি।
এবারের পরিষদে বেশি আলোচনা হচ্ছে শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। আগের কাঠামোয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে ছিল না ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধি। কিন্তু নতুন কমিটিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করায় নীতিনির্ধারণে শিল্প খাতের প্রভাব বাড়বে কি না, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
চলতি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬৯
হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় কমাতে দেওয়া
হয়েছে বিভিন্ন কর ও শুল্ক
ছাড়।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে বলে সরকারের দাবি। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালসহ বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে আছে কর রেয়াত।
‘ওষুধের তালিকা হালনাগাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বাজার তদারকি নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না নতুন তালিকার সুফল’— সতর্ক করলেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।
স্বাস্থ্য সচিব ও কমিটির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর ভাষ্য, আগের তালিকাসহ সব বিষয় পর্যালোচনা শেষে তৈরি করা হবে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কাঠামো। তবে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অন্য জায়গায়— নীতিগত পরিবর্তনের পর তাদের প্রেসক্রিপশনের খরচ আদৌ কমবে কি না। সেটি নিয়েও কাজ করছে সরকার।
ওষুধের
দাম না করার কারণ
জানালেন পরিষদের সাবেক সদস্য স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল
হামিদ। আগামীর সময়কে বলছিলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করতে
এ কমিটি গঠনের পাশাপাশি সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে দাম।
দফায় দফায় মূল্য বাড়ানোর
পরও উৎপাদনকারীরা বলছেন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ দাবির
পেছনে কী আছে তা
খুঁজে বের করতে হবে।
সব মিলিয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে দাম নিয়ন্ত্রণ করলে
শিল্প যেমন বাঁচবে, তেমনি
স্বস্তি পাবে সাধারণ মানুষ।




