বাস ট্রেন লঞ্চ রিকশা— সব কটিতেই উঁচু পাদানিতে অসহায় প্রবীণরা
- প্রবীণদের চলাচল অনুপযোগী গণপরিবহন
- শারীরিক সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা
- প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মৎস্য ভবন এলাকায় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন ৬১ বছর বয়সী আশিকুর রহমান। যাবেন মিরপুরের গাবতলীতে, মেয়ের বাসায়। প্রায় ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর একটি গাবতলীগামী বাস আসে। কিন্তু সেটিতে উঠতে পারেননি তিনি। বাসটি যাত্রী তোলার জন্য পুরোপুরি থামেনি। গতি কিছুটা কমিয়ে চলন্ত অবস্থাতেই যাত্রী তুলছিল। কয়েকজন তরুণ দ্রুত বাসে উঠে পড়লেও সেই চেষ্টা করার সামর্থ্য ছিল না আশিকুর রহমানের।
এরপর আরেকটি বাস এলেও তাতে কোনো আসন খালি ছিল না। তরুণ যাত্রীরা দাঁড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে আশিকুর রহমানের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ৮ নম্বর রুটের একটি বাসে ওঠার চেষ্টা করেন। দরজার হাতল ধরে এক পা রাখেন ফুটবোর্ডে। কিন্তু উঁচু পাদানিতে পা তুলে বাসে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়। অনেকটা যুদ্ধ করে বাসে উঠলেও যাত্রা শুরু হয় নানা শঙ্কা নিয়ে।
শুধু আশিকুর রহমান নন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসে চলাচল করতে গিয়ে এমন ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক প্রবীণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমলেও গণপরিবহনে ওঠা-নামার ব্যবস্থায় সেই বাস্তবতার প্রতিফলন নেই। উঁচু ফুটবোর্ড, চলন্ত বাসে ওঠা-নামা, অতিরিক্ত ভিড় এবং সহযোগিতার অভাব তাদের চলাচল কঠিন করে তুলেছে। বাসে ওঠার জন্য দৌড়ানো কিংবা চলন্ত বাস থেকে নামার ঝুঁকি নেওয়া এখন তাদের প্রতিদিনের যাত্রার অংশ।
দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে
একই পরিস্থিতি ট্রেন এবং লঞ্চেও। অথচ সীমিত আয়ের অনেক প্রবীণের কাছে গণপরিবহনই যাতায়াতের প্রধান ভরসা। বিকল্প পরিবহনের বাড়তি ভাড়া বহন করতে না পারায় ঝুঁকি ও ভোগান্তি নিয়েই চলাচল করেন তারা। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবীণদের জন্য নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করা কেবল তাদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়। এটি গণপরিবহনে সবার সমান প্রবেশাধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে চলাচলের অধিকারের প্রশ্ন।
উঁচু ফুটবোর্ড, চলন্ত বাসে ওঠানামা
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, অনেক বাসের ফুটবোর্ড ভূমি থেকে প্রায় এক থেকে দেড় ফুট উঁচু। পাদানিতে পা রেখে বাসে উঠতে হয়। শারীরিকভাবে দুর্বল প্রবীণদের পাশাপাশি লাঠিতে ভর দিয়ে চলা মানুষের জন্যও এটি বড় বাধা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস পুরোপুরি না থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করানোর প্রবণতা।
কিছু বাস যাত্রী তোলার সময় গতি সামান্য কমালেও পুরোপুরি থামে না। নামার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে চলতে থাকে। তরুণদের জন্য বিষয়টি সহজ। কিন্তু প্রবীণদের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া বা পায়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি।
বাসে ওঠা-নামার সময় প্রবীণ যাত্রীদের সহযোগিতা করার মতো লোক না থাকাও বড় সমস্যা। রাজধানীর অনেক বাসে চালকের সঙ্গে সহকারী থাকেন না। ফলে বাসে ওঠার সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া, নামার সময় সহযোগিতা করা কিংবা নিরাপদে ওঠা-নামার সুযোগ করে দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায় না।
ষাটোর্ধ্ব যাত্রী নাদিম সরদার আগামীর সময়কে বলেন, ‘যখন যুবক ছিলাম, তখন দৌড়ে বাসে উঠে যেতাম। কিন্তু এখন আর সেই সক্ষমতা নেই। থেমে থাকা বাসে উঠতেই কষ্ট হয়। যেখানে পা দিয়ে উঠব, সেটিই অনেক উঁচু। অথচ অনেক সময় চলন্ত বাসেই উঠতে হয়।’
বাসে উঠতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়ে একবার প্রায় ২০ দিন বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল নাদিমকে।
এমনিতে কর্মব্যস্ত সময়ে রাজধানীর বাসগুলোয় অতিরিক্ত ভিড় থাকে। এ সময় প্রবীণদের পক্ষে বাসে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসনে সাধারণ যাত্রীরা বসে থাকেন। প্রবীণ কেউ উঠলে তার জন্য আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও কম।
কয়েকজন প্রবীণ যাত্রী অভিযোগ করেন, বাসে ভিড় থাকলে তাদের নিতে অনীহা দেখান চালক ও সহকারীরা। হাত দেখালেও অনেক চালক বাস থামাতে চান না। ধীরগতির যাত্রীদের বাসে তুলতে বেশি সময় লাগবে, এমন ধারণা থেকেই তারা এ আচরণ করেন। আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রবীণ যাত্রীর পক্ষে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করাও সম্ভব হয় না।
প্রবীণবান্ধব নয় ট্রেন, লঞ্চ ও রিকশা
শুধু বাস নয়, ট্রেন এবং লঞ্চেও প্রবীণদের জন্য একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে।
রেললাইন বা ভূমি থেকে ট্রেনের পাদানির উচ্চতা প্রায় চার থেকে সাড়ে চার ফুট। পাদানিতে পা রেখে কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। এ কারণে সহজে ওঠা-নামার সুবিধার্থে প্ল্যাটফর্ম উঁচু করে নির্মাণ করা হয়। তবে বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরের অনেক স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলক নিচু। ফলে নারী ও প্রবীণ যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়। কোনোমতে দরজার হাতল ধরে পাদানিতে পা রাখতে হয় তাদের। স্টেশনে ট্রেন বেশিক্ষণ না থামায় অনেক সময় ঝুঁকি নিয়েই উঠতে হয়।
জলপথের পরিবহনেও দেখা যায় একই চিত্র। রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে লঞ্চে ওঠার প্রধান ব্যবস্থা সরু কাঠের তক্তা। টার্মিনালের এক প্রান্ত থেকে লঞ্চের প্রবেশপথ পর্যন্ত এই তক্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। নেই কোনো অস্থায়ী সিঁড়ি। নদীর ঢেউয়ে তক্তাটিও দুলতে থাকে। সেটি দিয়ে লঞ্চে উঠতে গিয়ে অনেক সময় যাত্রীরা ভারসাম্য হারান। প্রবীণদের জন্য এভাবে লঞ্চে ওঠা আরও কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
রিকশায় ওঠার ক্ষেত্রেও আছে একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা। পুরনো মডেলের রিকশার পাদানি প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট উঁচু। ফলে বয়সজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রবীণের পক্ষে রিকশায় ওঠা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
গণপরিবহনের ভোগান্তি এড়াতে বিকল্প হিসেবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা রাইডশেয়ারিং সেবা ব্যবহার করা যায়। তবে এসব পরিবহনের ভাড়া তুলনামূলক বেশি। ফলে সীমিত আয়ের প্রবীণদের বড় অংশের পক্ষে এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বাসের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে তাদের ওঠা-নামার ঝুঁকি ও ভিড়ের ভোগান্তি মেনে নিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাড়া নিয়ে হয়রানির অভিযোগ।
প্রবীণ যাত্রীদের ভাষ্য, বাসে অনেক সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা চাওয়া হয়। তবে আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তাদের যেন কিছুই করার নেই।
৬৬ বছর বয়সী আনোয়ার হোসেন আগামীর সময়কে বলেন, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে, সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছি। আমরা যেন সব জায়গায় বোঝা। বাসে উঠলে অনেকে খারাপ আচরণ করেন। উঠতেও ভোগান্তি। চালকেরা বাস পুরোপুরি থামান না। নামার সময়ও ভয়ে ভয়ে নামতে হয়। অর্থনৈতিক অবস্থাও এমন নয় যে বাস ছাড়া অন্য পরিবহনে যাতায়াত করব।’
সমস্যা শুধু যাতায়াতের ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদে চলাচল করতে না পারায় প্রবীণদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, কাজের সুযোগ ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন
যদিও প্রবীণদের এই সমস্যায় পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম।
তার ভাষ্য, ‘গণপরিবহনে চলাচলের ক্ষেত্রে প্রবীণদের জন্য সরকারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। রাতারাতি বদল আনাও সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে পরিবারকেও তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কোথাও বেরোলে সঙ্গে ছেলেমেয়ে কিংবা পরিবারের কারও থাকা উচিত।’
বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী, বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। তারা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তখন তারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ হবেন।
প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চলাচলের উপযোগী পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। অথচ রাজধানীতে স্বল্প খরচে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম বাসেই সহজে ওঠা-নামা ও প্রবেশাধিকারের ঘাটতি রয়েছে।
২০২৪ সালে ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ঢাকার গণপরিবহনে প্রবীণদের চলাচলের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরা হয়। ঢাকার দুটি পৃথক আর্থসামাজিক এলাকার ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩০ জনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, বাসের ভিড় ও যানজট প্রবীণদের ওঠা-নামায় বড় বাধা। পাশাপাশি পরিবহনকর্মী ও সহযাত্রীদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এবং বয়সজনিত বৈষম্যেরও মুখোমুখি হন তারা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব সমস্যা শুধু যাতায়াতের ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদে চলাচল করতে না পারায় প্রবীণদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, কাজের সুযোগ ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
রাজধানীর গণপরিবহনে প্রবীণদের অভিজ্ঞতাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। অবশ্য বয়সের কারণে শারীরিক সক্ষমতা কমে আসা স্বাভাবিক। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহনে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এই অধ্যাপক আগামীর সময়কে বলেন, ‘নগরে চলাচল করা গণপরিবহনগুলো আদর্শ নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। এসব বাসে চলা যায় না। এগুলো ফেলে দিয়ে নতুন গাড়ি নামাতে হবে। সেসব নতুন গাড়ি একই মাপের হবে। সব গাড়ির ক্ষেত্রে মাটি থেকে পাদানির উচ্চতা একই থাকবে।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মেট্রোতে এই সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে বাসে কেন হবে? আন্তঃনগর পর্যায়ে চলাচল করা বাস ও ট্রেনের ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন হতে পারে। তাতে হয়তো বছরে দুবার চড়া হয়। কিন্তু নগরের ভেতরে চলা গাড়িতে প্রায় উঠতে হয়। তাই আন্তঃনগরের ক্ষেত্রে যা আছে তা থাকলেও নগরের ভেতরে চলা যানে পরিবর্তন আনতেই হবে।’






