বাস রুট রেশনালাইজেশন: রঙ বদলালেও ভঙ্গুর সেবা
- হতাশ যাত্রী, পূরণ হয়নি প্রত্যাশা
- প্রথম দিনেই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন, পথে ছিল বাসের সংকটও

পুরনো বাস সাজিয়ে রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় চালানো হচ্ছে। ছবি: আগামীর সময়
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয়টি রুটে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ১৮টি পরিবহন কোম্পানির বাস একীভূত করে ছয়টি কোম্পানিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থার প্রথম দিনেই যাত্রীদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে। বাসের রঙ ও নাম পরিবর্তন হলেও সেবার মান, বাসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, যাত্রী ওঠানামা এবং ভাড়া আদায়ের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোথাও কোথাও বাসের সংকটেও পড়তে হয়েছে যাত্রীদের।
আজ রবিবার সকাল ১০টার দিকে রায়সাহেব বাজার থেকে চিড়িয়াখানা যাওয়ার জন্য তানজিল পরিবহনের বাস খুঁজছিলেন সুদীপ্ত কর্মকার। এই স্টপেজ থেকেই আগে বাসটি ছাড়ত। কিন্তু সেখানে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে থাকলেও তানজিল পরিবহনের কোনো বাস খুঁজে পাননি তিনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অন্য একটি বাসের চালকের সহকারীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, নতুন ব্যবস্থায় বাসটির নাম ও স্টপেজ পরিবর্তন হয়েছে। এখন তাঁতীবাজার স্টপেজ থেকে বাসটি ধরতে হবে।
ওই স্টপেজ থেকে চিড়িয়াখানাগামী অন্য কোনো বাস না থাকায় হেঁটে তাঁতীবাজারে যেতে হয় তাকে। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চিড়িয়াখানাগামী একটি বাস পান। বাসটির সামনে লেখা ছিল ‘চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহন’। বাসে উঠে জানতে পারেন, তিনটি পরিবহনের বাস একীভূত করে নতুন এই কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। বাসের রঙ পরিবর্তন হলেও ভেতরের অবস্থা আগের তানজিল পরিবহনের মতোই।
সুদীপ্ত কর্মকার বললেন, ‘এখন থেকে প্রতিনিয়তই আমাকে হেঁটে পরের স্টপেজে গিয়ে বাসে উঠতে হবে। এটি আমার জন্য বাড়তি ভোগান্তি।’
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ থেকে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এসব রুটে চলা বিদ্যমান বাসগুলো নিয়ে এ কার্যক্রম চালু হয়েছে। সকাল থেকেই বাস চলাচল শুরু হলেও বেলা ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন হয়।
সরেজমিনে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, গুলিস্তান, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট ও কাকরাইল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরনো বাসগুলোই নতুন নাম ও ব্যানারে চলাচল করছে। কয়েকটি পরিবহনের বাস একীভূত করে দেওয়া হয়েছে নতুন কোম্পানির অধীনে। বাসের আগের রঙের ওপর নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। ছয়টি রুটের জন্য ছয় ধরনের রঙ নির্ধারণ করা হলেও সব বাসে এখনো তা করা হয়নি। কিছু বাসে রুট নাম্বারও লেখা ছিল না।
কোনো কোনো বাসে নতুন রঙের আড়ালে পুরনো রঙ ও নাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। যেমন ‘সময়’ পরিবহনের একটি বাসের গায়ে আগের রঙ ও নাম দেখা গেলেও সামনের ব্যানারে লেখা ছিল নতুন কোম্পানির নাম। রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহনের বাস একীভূত করে ‘ফোর স্টার’ বাস লাইন নামে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে চালানো হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জানিয়েছেন, নগরের যানজট ও বিশৃঙ্খলা শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করছে না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঢাকায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব সারা দেশে পড়বে।
সব বাসের রঙ করা সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলছিলেন, কম সময়ের মধ্যে সব বাসের রঙ করা সম্ভব হয়নি। প্রায় সাড়ে ৫০০ বাসে রঙ করা হয়েছে। বাকি বাসগুলোতেও শিগগিরই রঙ করা হবে। যেসব বাসে রুট নাম্বার লেখা নেই, সেগুলোতেও নাম্বার উল্লেখ করতে হবে।
তবে শুধু বাসের রঙ ও নাম পরিবর্তনকে নতুন ব্যবস্থার কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন না যাত্রীরা। তাদের অভিযোগ, বাসের ভেতরের পরিবেশ আগের মতোই রয়েছে। অনেক বাসের জানালার কাচ ভাঙা, কোনো কোনো জানালা আটকে আছে। জানালায় পর্দা নেই, ফ্যান নষ্ট, আসন নড়বড়ে এবং সিটের পর্দাও অপরিষ্কার। যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে এসব সমস্যার সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
ফোর স্টার বাসের যাত্রী মো. নাজির উদ্দীন বলছিলেন, ‘বাসের শুধু রঙ পরিবর্তন হয়েছে, বাকি কোনো পরিবর্তন তো হয়নি। এখনো রাস্তার মাঝখানে ব্রেক কষে যাত্রী তোলা হচ্ছে। আশা করেছিলাম, নতুন পদ্ধতিতে যাত্রীসেবা বাড়বে। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই আশা ভেঙে গেল।’
পথে বাসের সংকটও দেখা গেছে। আজ দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ফার্মগেট বাস স্টপেজে চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করেও কোনো বাস পাননি কয়েকজন যাত্রী। সেখানে অপেক্ষারত আহাদ রেজা বলছিলেন, ‘প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি। সদরঘাটগামী একটি বাসও পাচ্ছি না। শুনলাম, এই রুটে নতুন বাস চলছে। কিন্তু এখনো একটিও পেলাম না।’
নতুন কোম্পানির অধীনে বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রজাপতি, পরিস্থান একীভূত করে গঠন করা হয়েছে পিএনপি সিটি পরিবহন। আগে পরিস্থান পরিবহনের চালক ছিলেন মো. আকাশ। তিনি জানিয়েছোন, এই তিন পরিবহনের অধীনে প্রায় ৩০০টি বাস ছিল। এর মধ্যে ১৫০টি বাস নতুন কোম্পানির অধীনে রাখা হয়েছে। বাকি বাসগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট রুটে বাসের সংখ্যা কমেছে।
নতুন ব্যবস্থায় বাসের ভাড়া আদায়েও এখনো পরিবর্তন আসেনি। বাসগুলো আগের মতোই ওয়েবিল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করছে। কোনো বাসেই চালু হয়নি ই-টিকেটিং ব্যবস্থা। টঙ্গী থেকে কলেজগেট রুটে চলাচলকারী এসি বাস ঢাকা চাকার চেয়ারম্যান মন্টু মিয়া আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আপাতত কাউন্টারভিত্তিক যাত্রী তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। যাত্রীছাউনি আছে, এমন নির্ধারিত স্থানে বাস থামবে। এর বাইরে রাস্তার মাঝখানে ইচ্ছামতো যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এসি বাসের ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, এসি বাসে জ্বালানি খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি। তাই নন-এসি বাসের মতো প্রতি কিলোমিটারে একই ভাড়া রাখা সম্ভব হবে না।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনায় চালকদের নির্দিষ্ট বেতনে নিয়োগ এবং মালিকদের কোম্পানির আয় অনুযায়ী লভ্যাংশ দেওয়ার কথা রয়েছে। এতে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমবে এবং বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রথম দিনেই এ পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চালক ও শ্রমিকদের বেতনভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে তাদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না। আপাতত একটি রুটে এসি বাস চলবে। পাঁচটি রুটে এসি বাস পাইলটিং হিসেবে নেওয়া হয়েছে। বাকি বাসগুলো কিনতে হবে। দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে আরও চারটি রুটে বাস চালু করা হবে।





