মোস্তফাপুর
বর্ষা হলেই বন্ধ যাতায়াত

ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুর সদরের ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের একটি সড়ক যেন বর্ষা এলেই দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। উত্তর বড় বাড্ডা থেকে দক্ষিণ বড় বাড্ডা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের পুরোটাই কাঁচা। বৃষ্টিতে সড়কে জমে থাকে পানি, তৈরি হয় কাদা ও অসংখ্য গর্ত। তখন যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে স্থানীয়দের।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন দেখা যায় এমন চিত্র।
এলাকাবাসীর দাবি, সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় বড় খালপাড়, জয়াইর, হাদুল্লাপুরসহ আশপাশের অন্তত আটটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষকে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন সড়কটি দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবীসহ প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষ চলাচল করেন।
সম্প্রতি হঠাৎ বুকে ব্যথা ওঠে ষাটোর্ধ্ব সাফি বেগমের। দ্রুত চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও বাড়ির সামনে কাদায় আটকে যায় ভ্যান। শেষ পর্যন্ত স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন মিলে কাদামাখা সড়কে ভ্যান ঠেলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
সাফি বেগমের স্বজনেরা বলেন, ‘রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা থাকলেও রাস্তার কারণে সময় নষ্ট হয়েছে। বর্ষায় এই সড়ক দিয়ে কোনো যান ঠিকমতো চলতে চায় না। জরুরি রোগী হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শুধু সাফি বেগম নন, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও একই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। রাতের বেলায় দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
বর্ষায় সড়কটি কর্দমাক্ত হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে সমস্যায় পড়ে শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে কাদা পেরিয়ে তাদের চলতে হয়। বৃষ্টির দিনে কেউ কেউ বিদ্যালয়ে যাওয়া এড়িয়ে যায় বলেও জানান স্থানীয়রা।
কৃষকদেরও পড়তে হয় বিপাকে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া কিংবা কৃষি উপকরণ বাড়িতে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। যানবাহন না চলায় অতিরিক্ত ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হয়।
ভ্যানচালক তমিজউদ্দিন বলেন, রাস্তার যে অবস্থা ভ্যান নিয়ে যাতায়াত করা কঠিন।সরকার যদি রাস্তাটা ঠিক করে দেয় তাহলে ভালো হয়।
কৃষক আলী হোসেন মিয়া জানালেন, পণ্য নিয়ে যেতে বড় কষ্ট। এখন পাট নিয়ে যেতে কষ্ট হয়। এখানে ভ্যানও চলতে চায় না। রাস্তাটা মেরামত করলে ভালো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা শৌরভ হোসেন বলেন, ‘শুকনা মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা যায়। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হলেই মনে হয় আমরা মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাজারে যাওয়া কিংবা অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়া—সবকিছুতেই দুশ্চিন্তা করতে হয়।’
আরেক বাসিন্দা জাকির শেখ বলেন, ‘বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতেও অনেকে এখন চিন্তা করেন। বর্ষার সময়ে বরযাত্রী বা অতিথির গাড়ি বাড়ি পর্যন্ত আসতে পারে না। ফলে সড়কটি শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, আমাদের সামাজিক জীবনেও প্রভাব ফেলছে।’
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে সম্প্রতি সড়কটি পাকা করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে মাটি ফেলে সড়ক সংস্কার নয়, স্থায়ীভাবে সড়কটি নির্মাণ করতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা বলেন, আট গ্রামের মানুষের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত পাকা করা হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বর্ষার আগে সড়কের কাজ শুরু না হলে আগামী দিনগুলোতেও একই দুর্ভোগ বহন করতে হবে তাদের।
মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব খান বলেন, ‘সড়কটির দুরবস্থার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। বর্ষায় স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি হয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে সড়কটি পাকা করার কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘এলাকাবাসীর দাবির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। সড়কটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’







