দর বৃদ্ধিতে বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির রাজত্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্যবসা নেই, কারখানা বা উৎপাদন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, কিংবা ঋণে জর্জরিত হয়ে নেমে গেছে নিম্নমানের ক্যাটাগরিতে—এমন সব বন্ধ ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিই এখন দেশের শেয়ারবাজারের দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসছে। ডিএসই’র সাম্প্রতিক বাজার চিত্র বিশ্লেষণ করে শেয়ারবাজারের এই অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈপরিত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো যখন আড়ালে পড়ে থাকছে, তখন কেবলই জল্পনা-কল্পনা ও কারসাজির ওপর ভর করে বন্ধ এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর তরতর করে বাড়ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলতে কিংবা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়াতেই একটি নির্দিষ্ট চক্র বারবার এমন সব দুর্বল শেয়ার বেছে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আজ বুধবার দর বৃদ্ধির তালিকার প্রথম সারিতেই উঠে এসেছে নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার লিমিটেড। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক ১ টাকা ২৭ পয়সায় নেমেছে, আর সম্পদ মূল্য বা এনএভি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ টাকা ২৬ পয়সায়।
দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শন দল সরেজমিনে গিয়েও কারখানা অচল পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অথচ গত কয়েক কার্যদিবসে লেনদেনের চিত্র দেখলে মনে হবে কোম্পানিটির ব্যবসায় অভাবনীয় জোয়ার এসেছে; সর্বনিম্ন দর ১ টাকা ১০ পয়সা থেকে লাফিয়ে শেয়ারটি এখন ৩ টাকা ৩০ পয়সায় কেনাবেচা হচ্ছে।
একই রকমের চরম বৈপরিত্য দেখা যাচ্ছে তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইয়েং লিমিটেডের ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিনের অচল কারখানা, জং ধরা যন্ত্রপাতি এবং আংশিক থেকে পূর্ণাঙ্গ বন্ধের দিকে যাওয়া উৎপাদন সত্ত্বেও শেয়ারবাজারে এই কোম্পানির দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তলানিতে নেমে যাওয়া এই শেয়ারটি হঠাৎ করেই ৩ টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন হতে দেখা গেছে এবং দৈনিক গড় লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ২৮ লাখ শেয়ারের ঘরে।
টেক্সটাইল খাতের সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল লিমিটেডের আর্থিক চিত্র আরও সঙ্গিন, যেখানে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্যের ঘাটতি বা রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩৩০ কোটি টাকায়। দুর্বল আর্থিক পারফরম্যান্সের কারণে গত বছরের শুরুতে কোম্পানিটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়। পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে চলতি ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের শেয়ার কেনায় মার্জিন ঋণ সুবিধা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এত কঠোর আইনি বিধিনিষেধ ও আর্থিক ভঙ্গুরতার পরও দর বৃদ্ধির দৌড়ে থামেনি কোম্পানিটি; গত এক বছরে ১ টাকা ৭০ পয়সার নিম্নসীমা থেকে বেড়ে এর শেয়ার দর ৪ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত ছুঁয়েছে।
প্রযুক্তি খাতের ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক লিমিটেডের (আইএসএন) ব্যবসায়ের গতিও একই পথে হাঁটছে। কোম্পানিটি বর্তমানে ঋণাত্মক ০.৫৪ টাকার ইপিএস নিয়ে ক্রমাগত আর্থিক লোকসান গুনে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪২ টাকা থেকে দর বেড়ে ১৩১ টাকার বেশি উচ্চসীমায় পৌঁছে চমক দেখিয়েছে কোম্পানিটি, যা স্বাভাবিক বাজার যুক্তির সম্পূর্ণ বিপরীত।
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে সতর্ক করছেন যে, যখন মূল বাজার সূচক ও লেনদেন পতনের মুখ দেখছে, তখন এসব কারখানা বন্ধ ও ক্রমাগত লোকসানে থাকা কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক বিষয় নয়। কোনো দৃশ্যমান ব্যাবসায়িক অগ্রগতি ছাড়া কেবল গুজব ছড়িয়ে দর বাড়ানোর এই চক্রে পা দিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত চরম আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারেন।





