স্মরণে হুমায়ুন আজাদ
আপসহীন এক অলৌকিক ইস্টিমার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজ ১২ আগস্ট, হুমায়ুন আজাদের প্রয়াণ দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে জার্মানির মিউনিখে এক নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটের বদ্ধঘরে নিভে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এক অকুতোভয় শিখা। মাত্র সাতান্ন বছরের জীবনে তিনি বাংলা ভাষাকে উপহার দিয়ে গেছেন ৭০টিরও বেশি গ্রন্থ; কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভাষাবিজ্ঞান, কিশোর সাহিত্য— যেন এক জীবনে কয়েকটি জীবন বাঁচার তাগিদে কলম চালিয়ে গেছেন তিনি নিরন্তর। ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক ও নির্ভীক কলামিস্ট; কিন্তু সর্বোপরি ছিলেন আপসহীনতার এক জ্বলন্ত প্রতীক।
১৩৫৪ বঙ্গাব্দের ১৪ বৈশাখ, ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের রাড়িখাল গ্রামে জন্ম। বাবা আবদুর রাশেদ, মা জোবেদা খাতুন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশন থেকে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৬৭ সালে স্নাতক ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর— দুটোতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। ১৯৭৬ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণ’ বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন, যা পরে প্রোনোমিনালাইজেশন ইন বেঙ্গলি নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ১৯৭৮ সালে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। স্ত্রী লতিফা কোহিনুর, দুই কন্যা মৌলি ও স্মিতা এবং একমাত্র পুত্র অনন্য আজাদ— এই নিয়ে ছিল তার সৃজনের সংসার।
হুমায়ুন আজাদ ষাটের দশকের কবিদের সমকালীন, আধুনিক কবি। কবি হিসেবে তেমন জনপ্রিয়তা না পেলেও আমৃত্যু কবিতার সন্ধান করেছেন। ষাটের দশকের হতাশা, দ্রোহ, ঘৃণা, বিবমিষা ও প্রেম তার কবিসত্তার প্রধান নিয়ামক। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (জানুয়ারি ১৯৭৩), নামটি এসেছে ছেলেবেলায় রাতে পদ্মায় ভেসে আসা স্টিমারের ধ্বনি থেকে। এরপর ধারাবাহিকভাবে এলো ‘জ্বলো চিতাবাঘ’ (মার্চ ১৯৮০), ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ (এপ্রিল ১৯৮৫), ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল’ (মার্চ ১৯৮৭), ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯০), ‘কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮) এবং জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পেরোনোর কিছু নেই’ (ফেব্রুয়ারি ২০০৪)। মৃত্যুর পর ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় তার ‘কাব্যসমগ্র’।
ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আজাদের আবির্ভাব ১৯৯৪ সালে ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ নামের এক অসামান্য আখ্যানের মাধ্যমে। সামরিক শাসনের ছায়ায় নিমজ্জিত এক বাংলাদেশ, মধ্যবিত্তের অসহায়তা আর স্বৈরাচার-পরবর্তী গুমোট সমাজের যে ছবি তিনি এঁকেছেন, তা আশির দশকের এক অমোচনীয় দলিল। ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’, ‘মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ’, ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’, ‘ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ’, ‘১০,০০০, এবং আরো ১টি ধর্ষণ’— পরবর্তী সময়ের এসব উপন্যাসে তিনি নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যৌনতা, সমাজের ভণ্ডামি ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণ ভেঙেছেন ক্রমাগত। একই সময়ে ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’র মতো উপন্যাস লিখেছেন, যেখানে কৈশোরের স্মৃতিমেদুর গল্প বলেছেন জলকদর চরিত্রের ভেতর দিয়ে।
কিন্তু যে গ্রন্থটি তাকে হত্যার টার্গেটে পরিণত করেছিল, তা ২০০৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’। এই উপন্যাসে তিনি ধর্মীয় মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দিয়ে তাদের এক নিষ্ঠুর শৈল্পিক রূপ দেন। বইটি প্রকাশের পর নানাভাবে হুমকির মুখে পড়েন তিনি। ওরা তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে; হুঁশিয়ারিও আসে। কিন্তু তিনি ভয় পাওয়ার বা থেমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না।
প্রবন্ধ ও গবেষণায় হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিমগ্ন এক সাধক, তুলে এনেছিলেন বিরল প্রাজ্ঞতা। ভাষাবিজ্ঞানে ‘বাক্যতত্ত্ব’, ‘অর্থবিজ্ঞান’, ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’-এর মতো মৌলিক কাজ এবং ‘বাঙলা ভাষা’র সংকলনগ্রন্থ তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৬) এনে দেয়। কিন্তু সবচেয়ে তুমুল আলোচিত-সমালোচিত বই ‘নারী’ (১৯৯২)। নারীবাদী এই গ্রন্থে তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র সমালোচনা করেন। বইটি ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’-এর অনুবাদ এবং ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’-এর মতো গ্রন্থে তিনি একই সঙ্গে সমাজদ্রষ্টা ও দার্শনিক হয়ে ওঠেন।
তোমাদের এই ট্রেন
১২ আগস্ট ২০২৬
তার প্রবচনগুচ্ছও ছিল দারুণ আক্রমণাত্মক। ‘আমাদের অঞ্চলে সৌন্দর্য অশ্লীল, অসৌন্দর্য শ্লীল। রূপসীর একটু নগ্ন বাহু দেখে ওরা হইচই করে, কিন্তু পথে পথে ভিখারিনীর উলঙ্গ দেহ দেখে ওরা একটুও বিচলিত হয় না’ কিংবা ‘কবিরা বাঙলায় বস্তিতে থাকে, সিনেমার সুদর্শন গর্দভেরা থাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রাসাদে’-এর মতো প্রবচন অনেকেরই পছন্দ হয়নি। আর এই অপ্রিয় সত্য বলার সাহসই তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্য চুকাতে হয়েছে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, রাত সোয়া ৯টার দিকে অমর একুশে বইমেলা থেকে হেঁটে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জেএমবি নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নির্দেশে ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায় আতাউর রহমান সানি, মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ, আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ, নূর মোহাম্মদ ওরফে শামীম ও হাফিজ মাহমুদ।
মিজানুর ও আনোয়ারুল পরে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন, মিনহাজ ও নূর মোহাম্মদ সরাসরি অস্ত্রের আঘাত করে; লোকজন এগিয়ে এলে আনোয়ারুল বোমা ফাটিয়ে পালাতে সাহায্য করে। রাত ১১টায় মোবাইলে আবদুর রহমানকে হামলার খবর জানানো হয়। হুমায়ুন আজাদ সেই হামলার পর ২২ দিন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ও ৪৮ দিন ব্যাংককে চিকিৎসা নেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরলেও আঘাতের ক্ষত তাকে তাড়িয়ে বেড়াত।
২০০৪ সালের ৭ আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনের ওপর গবেষণার বৃত্তি নিয়ে তিনি জার্মানির মিউনিখে যান। ১১ আগস্ট রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে ফিরে নিজ ফ্ল্যাটেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন; পরদিন ১২ আগস্ট নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় তিনটি পোস্ট কার্ড— ছেলে অনন্য, মেয়ে মৌলি ও স্মিতাকে লেখা শেষ চিঠি; আবছা হাতের লেখাগুলো ছিল তার শেষ উচ্চারণ।
হুমায়ুন আজাদের মরদেহ যখন দেশে আনা হয় তখন ঢাকা শহরে হৃদয়বিদারক সব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে রাড়িখালের পারিবারিক কবরস্থানে ইসলামি প্রথায় তাকে সমাহিত করা হয়। পরে তার কবরকে সিমেন্টে বাঁধিয়ে বইয়ের আকৃতি দেওয়া হয়— কারণ তিনি নিজেই বই হয়ে বেঁচে আছেন।
প্রথমে হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন ভাই মঞ্জুর কবির। বিদেশে মৃত্যুর পর তা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। তিন বছর তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ১৪ জানুয়ারি পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা পড়ে; ২০০৯ সালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত শেষ পর্যন্ত মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু— এ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। বন্দুকযুদ্ধে নিহত হাফিজ মাহমুদকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আত্মগোপনে থাকা নূর মোহাম্মদ ২০ বছর পর গ্রেপ্তার হন এবং রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। তবে এর আগেই অন্য একটি মামলায় ২০০৭ সালে আবদুর রহমান, বাংলাভাই ও সানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
হুমায়ুন আজাদ ভয় পেতেন না। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি লিখেছেন আপসহীনভাবে, বলেছেন অপ্রিয় সত্য। ‘অলৌকিক ইস্টিমার’-এর সেই কিশোর কবি, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’-এর নির্ভীক কথাশিল্পী, ‘নারী’র তাত্ত্বিক— সব একই মানুষ, যার কলমের কালি আর রক্ত একাকার হয়ে গেছে অমরত্বের পথে। আজ, প্রয়াণের এই দিনে, তিনি কেবল স্মরণীয় নন; তিনি আমাদের বিবেকের দায়, প্রতিজ্ঞা, উত্তরাধিকার।
হুমায়ুন আজাদ বেঁচে থাকুন আমাদের ভাষায়, আমাদের মননে— নির্ভীক, আপসহীন, একেবারে অলৌকিক ইস্টিমারের মতো।
আসুন পড়া যাক হুমায়ুন আজাদের অবিস্মরণীয় চারটি কবিতা।
ভালো থেকো
ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।
ভালো থেকো।
ভালো থেকো চর, ছোট কুঁড়ে ঘর, ভালো থেকো।
ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।
ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।
ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।
ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাঁশি।
ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।
ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।
ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,
ভালো থেকো বক, আড়িয়াল বিল,
ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।
আমি সম্ভবত খুব ছোট কিছুর জন্য
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে।
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
দোয়েলের শিসের জন্যে
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে
গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে
একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে।
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে
এক টুকরো মেঘের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়
হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে
এক ফোঁটা সবুজের জন্যে।
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।
আমাদের মা
আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতো না।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।
আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিল, কিন্তু ছিল আমাদের সমান।
আমাদের মা ছিল আমাদের শ্রেণির, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচণ্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।
ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।
আমাদের মা ছিল অশ্রুবিন্দু- দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিল বনফুলের পাপড়ি;- সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিল ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিল দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিল ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিল কিনা আমরা জানি না।
আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।
আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না
চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।
আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,
আমাদের মা বড় ছিল, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।
সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে
আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।
আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়ে না
আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না
আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করি না
আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।
কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল করে।
গোলাপ ফোটাবো
ওষ্ঠ বাড়িয়ে দাও গোলাপ ফোটাবো,
বঙ্কিম গ্রীবা মেলো ঝরনা ছোটাবো।
যুগল পাহাড়ে পাবো অমৃতের স্বাদ,
জ্ব’লে যাবে দুই ঠোঁটে একজোড়া চাঁদ।
সুন্দরীর নৌকো ঢুকাবো বঙ্গোপসাগরে,
অতলে ডুববো উত্তাল আশ্বিনের ঝড়ে।
শিউলির বোঁটা থেকে চুষে নেবো রস,
এখনো আমার প্রিয় আঠারো বয়স।
তোমার পুষ্পের কলি মধুমদগন্ধময়,
সেখানে বিন্দু বিন্দু জমে আমার হৃদয়।









