তোমাদের এই ট্রেন

কাশবনের রাজ্যে ট্রেন দেখতে চলেছে অপু আর দূর্গা। ছবি: সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী সিনেমা থেকে
ট্রেনের আসা আর যাওয়ার ভিতরে চিরকাল ফিরে পাওয়া আর হারিয়ে ফেলার আলোছায়াময় অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। একটা ট্রেন হুড়মুড় করে স্টেশনে ঢুকে অনেক যাত্রী নামিয়ে দিয়ে যায়। তাদের সকলের সঙ্গে আলাদা আলাদা গল্পও স্টেশনে নামে। সে গল্পে হাসি থাকে, ব্যস্ততা থাকে। আবার সেই ট্রেনই অনেক যাত্রী তুলে নিয়ে চলে যায় প্ল্যাটফর্ম শূন্য করে। তাদের সঙ্গে চলে যায় কয়েক দিনের আনন্দ আর বিষাদের খণ্ড খণ্ড ছবি। তখন প্ল্যাটফর্মে হাওয়ায় ওড়ে বাদামের শূন্য ঠোঙা, বেঞ্চিতে পড়ে থাকে দিনের বাসি খবরের কাগজ। ট্রেনের কামরায়ও গল্প একটু একটু করে ক্ষণস্থায়ী মাকড়সার জালের মতো বিস্তারিত হয়। ট্রেনের গতির সঙ্গে গল্পগুলোও ছুটতে থাকে গন্তব্যে। তারপর এক সময় হুইসেল বাজে। ট্রেন থামে। কামরার ভিতরের গল্প হারিয়ে যায় অন্য কোনো স্টেশনে। জীবনের গল্প নিয়ে ট্রেন আসে, ট্রেন চলেও যায়। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন- কেন আমি পিছে ফেলে যাই তোমাদের! এই ট্রেন- এই রাত- এই হিম- এ কি আমি চাই! সাদা কুয়াশার মতো ছড়িয়ে গড়া কাশবনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের চলে যাওয়া দেখেছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসের অপু আর দুর্গা। দুটি চরিত্রের ভিতরে বিষ্ময় আর আনন্দের নির্মাণ আজও আবিষ্ট করে রেখেছে সাহিত্যের পাঠকদের। বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সেই ট্রেন আর কাশবনকে বাঁধলেন সেলুলয়েডে। কাশবনের ভিতর দিয়ে দুই ভাইবোনের ছুটে আসা আর লং শটে ট্রেনের চলে যাওয়া আরেকবার যেন পথের পাঁচালিকে অমরত্ব দিল। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের কবি আবুল হাসান কবিতায় লিখলেন, রাত্রিবেলা ট্রেনের বাঁশি/ শুনতে আমার খারাপ লাগে। ট্রেনের হুইসেল কবিতায় বাঁশি হয়ে গিয়ে মনের মধ্যে বাজিয়ে তোলে বেহাগের সুর। গতিময় এই পরিবহণ যানের মধ্যে বিচ্ছেদ আর ফিরে আসার অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়ে মিশে থাকে। আর এই অনুভূতিকে পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছেন গল্পে, উপন্যাসে। কাজে লাগিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। ফলে গল্প, কবিতা আর চলচ্চিত্রে ট্রেন নিজেই একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা গল্পের প্রখ্যাত লেখক আগাথা ক্রিস্টির ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ উপন্যাসে রহস্যে মোড়া খুনের গল্প পা রেখেছে ট্রেনের কামরায়। সেখানে চলন্ত ট্রেনে ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনার তদন্ত করতে নেমেছে আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা চরিত্র এরকুল পয়রো। লোমহর্ষক সেই গল্পে ট্রেনও হয়ে ওঠে ভীষন এক চরিত্র। এই রহস্য গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র। একবিংশ শতাব্দীর লেখিকা পলা হকিন্সের ‘গার্ল অন দ্য ট্রেন’ উপন্যাসে ট্রেনযাত্রী একটি মেয়ে ট্রেনের জানালা থেকে দূরে একটি বাড়িতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হয়ে যায়। তবে থ্রিলারের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে যায় প্রখ্যাত রুশ ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাস। সেখানে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত ট্রেনের তলায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। মজার বিষয় হচ্ছে, টলস্টয় নিজে ট্রেন ভ্রমণ পছন্দ করতেন না। সাহিত্যের আলোচকরা বলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে ট্রেনকে প্রযুক্তির নির্দয় এক শক্তি হিসেবে উপন্যাসে হাজির করেছেন যা শুধু ধ্বংস ডেকে আনে।
বুদ্ধদেব বসুর ‘বাসরঘর’ বা ‘রাত ভরে বৃষ্টি’ উপন্যাসে অথবা ‘দুই বন্ধু’ নামে ছোটগল্পে রাতের ট্রেনে ক্ষণিকের সম্পর্কের বিবরণ আছে। কিন্তু ‘রাতের ট্রেন’ নামে তাঁর একটি বহুল পঠিত কবিতা রয়েছে কঙ্কাবতী কাব্যগ্রন্থে। কবিতাজুড়ে ছুটে চলা ট্রেনটি একটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠে সময়, যান্ত্রিকতা এবং আধুনিক মানুষের গতিশীল বিচ্ছেদের গল্পকে মূর্ত করেছে।
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’। দীর্ঘ একটি ট্রেন যাত্রা এবং বিভিন্ন পটভূমি ও চরিত্র সেখানে মানুষের আচরণ ও চিন্তার ভিন্নতাকে উপস্থিত করেছে। এই উপন্যাস নিয়ে সম্প্রতি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে যা দর্শকদের আলোড়িত করেছে।
কারো চলে যাওয়া অথবা ফিরে আসার গল্প এই ট্রেন। বিগত শতাব্দী অথবা এই বর্তমানেও ট্রেনের গল্পে ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের ভাঙা ইতিহাসও থেকে যায়।






