আহা’র কবিতার অন্তর থেকে

আবুল হাসান (জন্ম: ৪ আগস্ট ১৯৪৭ – ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫)
প্রথমে পড়ে নিন ‘অভিধান’ শিরোনামের একটি কবিতা— যা লিখেছিলাম ২০০৮ সালে। এই কবিতার গভীরে, ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে আছে আমার প্রিয় কবি আবুল হাসান। তার জন্মদিন আজ, ৪ আগস্ট। যে কবি মাত্র ২৯ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালে।
অভিধান
আমার খুব বানান ভুল হয়।
হ্রস্ব ই-কার আর দীর্ঘ ই-কারে আমি সবসময় গুলিয়ে ফেলি। যেমন গুলিয়ে ফেলি দন্ত-ন আর মূর্ধণ্য-তে। সদ্যোজাত সব কবিতার প্রথম পাঠক তোকে দেখানোমাত্রই ভুল বানানগুলো কেটেকুটে ছেঁড়াবেড়া বানিয়ে দিতি আর আমার বিব্রতমুখ দেখতে দেখতে ঝাড়তি ‘‘অভিধান দেখতে পারিস না!’’
বানানগুলো নিয়ে অযৌক্তিক তর্ক জুড়ে দিতাম তোর সাথে। বলতাম, ‘তুই-ই তো আমার অভিধান।’ সবচেয়ে বেশি ভুল করতাম ‘ভীষণ’ বানানটাই মনে হয়। আর ছিল-কে ‘ছিলো’ লেখা কিংবা হল-কে ‘হলো’ লেখা আমার সবসময়ের মুদ্রাদোষ। এই তর্কে আমি আমার পাশে তোর প্রিয় কবি আবুল হাসানকে বনানী কবরস্থান থেকে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিতাম। তুই আবুল হাসানকেও ধুয়ে দিতে ছাড়তি না। আহা! আবুল হাসান। আবুল হাসানকে ব্যঙ্গ করে আহা বললেই রেগেমেগে একাকার হতি তুই।
বহুদিন রে, তিনলাইনের বেশি লিখতে পারিনা। তোর কথা মনে পড়ে যায়। আর তুই আমার লেখার শাদাখাতা দখল করে বসে থাকিস। লিখতে চাই ‘‘জলে-ঝড়ে ঘর ভাঙে, পুড়ে ছাই হয় যাবতীয় স্মৃতি, সৌধ। শুধু, দগ্ধ অনুষঙ্গে থরথর করে রাত, ভারী, পোড়া গন্ধ।” অথচ লেখা হয় তাই বলে, বেলা শেষে, নাকালই বা হবে কেন, রিক্তহাত বিষণ্ন বালক? কেন এই খুঁজে ফেরা, ভ্রষ্টলগ্নে নীলকণ্ঠ পাখিরপালক!
যাবতীয় আর ভারী— দুটোশব্দ, লাইব্রেরির সামনের খুনসুটি মনে করিয়ে দেয়। লেখার কথা ভুলে গিয়ে আমি বিষণ্ন নয়শোবার তোর নাম টাইপ করি। তোর নামের টাইপো-হরফের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে একটা লাইন ভেজে চলি, ধমনীতে জাগে তবু, শিরার গভীরে প্রভূ, রুধিরের রোল। প্রভু লিখতে গিয়ে তোর আশ্রয়ের অভাব অনুভব করি। যোগাযোগসেতু অনড় থাকলে এখনি ফোন করে জেনে নেয়া যেতো। কিন্তু নরকে নিক্ষিপ্ত পাপীর দৌঁড় কেবল ফেরেশতা পর্যন্ত। প্রভু কিংবা প্রভূর কাছে সে পৌঁছবে এমন সাধ্য কই!
নেই কেউ পোড়া ভিতে। পরিত্যক্ত কোঠা শুধু জলে ভেজে, রোদে পোড়ে; শুয়ে থাকে দিন-রাত নিশার জঠরে। আলেয়া যদিও এসে বেবাক নিশীথে কড়ি খেলে, বকে-ঝকে, সিঁড়ি বেয়ে ওঠে নামে, বোনে সূক্ষ্ম তন্তুজাল, ছেঁড়ে,(ছেড়ে তে কি চন্দ্রবিন্দু আছে রে!) তবু ভুতুড়ে (ভুতুড়ে বানানটাই ভুতুড়ে, দুটোই হ্রস্ব উ-কার!) আঁধারে শুধু গমগম করে নৈঃশব্দ্য (নৈঃশব্দ্য তে কি য-ফলা আছে!) দারুণ। কারা তবু মুখ খোঁজে অনড়(র!) পাথরে।
ভগবান পাঠক, আমার অভিধান হারিয়ে গেছে।
আমার ‘অভিধান’ কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে একটি শব্দ— ‘আহা’। তুই বলতি, ‘আহা! আবুল হাসান!’ আর তোর এই ‘আহা’ বলার ভেতর যে এক ধরনের করুণার সুর ছিল, তা আমি কখনো মেনে নিতে পারতাম না। আজ বুঝি, করুণা নয়— ওটা ছিল এক শ্লেষবাণসন্ধানদারুণা-মিশ্রিত শ্রদ্ধা। এক কাল্ট পোয়েটের প্রতি অনুজ কাব্যার্থীর নিবেদন; ভালোবাসা।






