মনোবল নয়, পুলিশের সংকট সরঞ্জামে
- সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ
- বর্তমানে পুলিশের বহরে ১৬২০০টি যানবাহন রয়েছে
- ৯৭৮৭টি মোটরসাইকেলের মধ্যে সচল ৫৫০৩টি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছর কেটে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলও এখন বেশ চাঙ্গা। তবে আইনশঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের সেই মনোবলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের যানবাহন ও জনবল সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশও করেছে কমিটি। গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এমন তথ্য জানা গেছে।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিনের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি। গতকাল রবিবার কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক হয়। বৈঠক থেকে বিরোধী দলের দুজন সদস্য ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যান।
আগের বৈঠকে জানানো হয়, বাহিনীর মোট হালকা ও ভারী যানবাহনের অর্ধেকেরও বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ওপর অধিকাংশ থানায় বরাদ্দ নেই পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। তীব্র লজিস্টিক ও যানবাহন সংকটের কারণে অপরাধীদের দ্রুত দমন এবং জরুরি প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে সময়মতো পৌঁছাতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। ফলে এর সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য ও আলোচনায় উঠে আসে জুলাই বিপ্লবে পুলিশ ভবন এবং যানবাহন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি। জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের বহরে ১৬ হাজার ২০০টি যানবাহন রয়েছে। এর সিংহভাগই অর্থাৎ ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেল। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০৩টি মোটরসাইকেল সচল রয়েছে। চার চাকার হালকা ও ভারী যানবাহনের ৬ হাজার ৫৫৮টি আট বছরের পুরনো। এসব চার চাকার গাড়ির মধ্যে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। যার বিপরীতে মাত্র ২ হাজার ২৪৯টি গাড়ি কেনা হয়েছে। প্রতি থানায় দুটি করে সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ২ হাজার ৬৫৬টি পিকআপের ঘাটতি রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও পুলিশের গতিশীলতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় যানবাহন এবং জনবল বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাবে এ সংকট কাটানো সম্ভব হচ্ছে না।
বৈঠকে সরকারদলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বললেন, অপরাধ দমনে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা নানামুখী লজিস্টিক সংকটে পড়ছেন।
প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে তারা ঠিকমতো ডিউটি করতে পারছেন না। এতে পুলিশের কর্মক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দ্রুত গাড়ি সংকট নিরসনের তাগিদ দেন। একপর্যায়ে তিনি বর্তমান পুলিশের যানবাহনের হালনাগাদ পরিসংখ্যান জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কমিটির সামনে যানবাহনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল মাঠপর্যায়ে পুলিশের টহলের জন্য নির্ধারিত গাড়ির তেলের বাজেটের তীব্র ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। জ্বালানি তেল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কঠিন বলে মত দেন তিনি। বললেন, একটি থানায় সাধারণ সময়ে যে পরিমাণ যানবাহন ও জ্বালানি বরাদ্দ থাকে, তা দিয়ে পুরো এলাকা কাভার করা সম্ভব হয় না। পুলিশের যানবাহনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কোনো বিশেষ স্থায়ী বরাদ্দ থাকে না। ফলে কর্মকর্তাদের নিজেদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করতে হয়। এ কারণে গাড়িগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে এবং অপরাধ দমন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়।
সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন আলোচনায় অংশ নিয়ে বললেন, জুলাই বিপ্লবের সময় পুলিশের অবকাঠামো বা গাড়ির মতো বস্তুগত ক্ষতির পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বড় ধরনের মানসিক ট্রমা গেছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের চলাচলে কনফিডেন্সের অভাব দেখা গেছে। পুলিশের সেই হারানো মনোবল ফিরিয়ে আনতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চান।
জবাবে সিনিয়র সচিব কমিটিকে অবহিত করেন, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব দূরীকরণে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তাদের মনোবল এখন আর বড় সমস্যা নয়। প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট খুব দরকার।
কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানতে চান, দেশের অধিকাংশ জায়গায় যানবাহন সংকটে পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে টহল ও ডিউটি করাতে গাড়ি সংকট নিরসনে উন্নয়ন বাজেটে কোনো বরাদ্দ আছে কি না।
জবাবে সিনিয়র সচিব কমিটিকে অবহিত করেন, পুলিশ অধিদপ্তরের উন্নয়ন বাজেটে ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ থেকে যানবাহন ক্রয়, থানা নির্মাণ ও স্পিডবোট কেনা হবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পর্যায়ক্রমে তা প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত অর্থবছরে ২৭২টি গাড়ি কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে পাওয়া যাবে।
এসব বিষয় খতিয়ে দেখে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে পুলিশের তীব্র যানবাহন সংকট নিরসনে অতি দ্রুত প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
শিরীন সুলতানার অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা তার এলাকা নরসিংদী এবং ঢাকার আশপাশের থানায় পদায়ন হচ্ছেন। এটি কীভাবে সম্ভব হচ্ছে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি! এমপি শিরীন জুলাই আন্দোলনে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পরে কমিটি তা সুপারিশ আকারে পাঠায়।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ২০২৫ সালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে জানিয়েছেন, এ সময়ের মধ্যে ৭০২টি ডাকাতি, ১ হাজার ৯৩৫টি দস্যুতা, ৩ হাজার ৭৮৮টি খুন, ৬৬টি দাঙ্গা, ৩ হাজার ২৩২টি ধর্ষণ ও ৭টি অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা-পূর্বক রিপোর্ট প্রদান-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই বিরোধী দলের দুজন সদস্য ওয়াকআউট করেন।







