বিদেশ নয়, দেশেই মিলবে উন্নত চিকিৎসা: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিদেশ নয়, দেশেই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার। চিকিৎসার জন্য যেন কাউকে দেশের বাইরে যেতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন হাসপাতাল ও দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবন ‘নিউরোসায়েন্স-২’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেছেন।
বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন ভবনটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্যসেবা শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। উন্নত চিকিৎসা শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায় না। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
সরকারপ্রধান বললেন, ‘আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, সুশাসন ও সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।’
৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নতুন ভবন উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে দেশ।-যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
স্ট্রোক, মৃগীরোগ বা খিঁচুনি, পারকিনসন্স রোগ, ডিমেনশিয়া ও মেরুদণ্ডের জটিল রোগকে বিশ্বজুড়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশেও এসব রোগের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। নতুন ভবন চালু হওয়ায় এসব রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা অনেক বাড়বে।’
আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধা ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড নিয়ে নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে শুধু রোগী ভর্তির সক্ষমতা বাড়বে না, চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষ যাতে কম খরচে বিশ্বমানের নিউরো চিকিৎসা পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, অতিরিক্ত শয্যা ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা দেশের হাজারো রোগীর জন্য আশার আলো হয়ে উঠবে।’
তবে চিকিৎসায় প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই।– বললেন তিনি।
চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক থাকা জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ‘চিকিৎসকেরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা রোগী ও স্বজনেরা চিকিৎসকদের ওপর আস্থা না রাখেন, তাহলে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।’
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে না হয়, সে জন্য ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।’
এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের মেয়াদে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
এ লক্ষ্যে খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ চলছে। আগামী অক্টোবর মাসে একযোগে পাঁচটি হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়া শুধু একটি স্লোগান নয়। দেশের মানুষ যাতে দেশেই প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পায়, সরকার সেই লক্ষ্যেই কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।
তিনি আরও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে চিকিৎসার জন্য কোনো নাগরিককে বিদেশে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না।’
অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খান সভাপতিত্ব করেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণ এবং শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত ও স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।







