গরিবের হাসপাতাল রাড্ডা টার্গেটে দেড় যুগ থেকেই
- রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুর
- সমিতির আড়ালে জমি ইজারার চেষ্টা ২০০৬ সালে
- গরিবের হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত রাড্ডা
- গতকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১২

লুটপাট ও ভাঙচুরের পর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
মিরপুরের নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা হয়ে ওঠা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের শুরু ১৯৭৪ সালে। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদানসহ নানা সেবা দিয়ে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি পাশে দাঁড়িয়েছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের। অথচ সেই সেবাকেন্দ্রই বারবার জমি দখলের চেষ্টার মুখে পড়েছে। সর্বশেষ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মিরপুর-১-এর শাখাটি। ঘটনায় ১২ জন গ্রেপ্তার হলেও এখনো অধরা নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারীরা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও অবশ্য থেমে নেই চিকিৎসাসেবা।
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। কারও কাছে এটি একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, আবার কারও কাছে হাসপাতালের চেয়েও বেশি কিছু। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এটি ‘গরিবের হাসপাতাল’। যেখানে সামর্থ্য কম হলেও চিকিৎসা মেলে, সন্তানকে টিকা দিতে এসে ফিরতে হয় না, আর অসুস্থতার সময়ে পাওয়া যায় দায়িত্বশীল সেবা।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের যাত্রা শুরু ১৯৭৪ সালে, সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে। প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগ পরিণত হয় বৃহত্তর কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে।
দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি মিরপুরের নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে নির্ভরতার নাম হয়ে ওঠে। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদানসহ নানা সেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করে যাচ্ছে তারা।
বর্তমানে মিরপুর-১০-এর প্রধান কেন্দ্রের পাশাপাশি মিরপুর-১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা বিস্তৃত। তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে প্যাথলজি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার আধুনিক সুবিধাও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদেও বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা। প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ও সাবেক উপদেষ্টা কাজী ফজলুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা এর ট্রাস্টি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ। এ ছাড়া বোর্ডের সদস্য হিসেবে রয়েছেন সরকারের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, আবদুল করিম এবং ব্যবসায়ী এ এস এম কাশেম ও এ কে আজাদ।
কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের এই ভরসার জায়গাটিই এখন ধ্বংসস্তূপ। হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবকাঠামো। যে আঙিনায় একসময় চিকিৎসা নিতে মানুষের ভিড় থাকত, সেখানে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা আসবাব ও ধ্বংসাবশেষ। তবু থেমে নেই সেবাকর্মীরা। খোলা আকাশের নিচে টেবিল-চেয়ার পেতে চলছে চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম।
এত দীর্ঘ ইতিহাস, বিস্তৃত সেবাকার্যক্রম এবং মানুষের আস্থার পরও প্রতিষ্ঠানটির মিরপুর-১ শাখা কেন বারবার জমি দখলের চেষ্টার মুখে পড়ল, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে কারা, কেনইবা একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তবে তদন্তে উঠে আসছে আরও পুরনো এক ইতিহাস। স্থানীয় বাসিন্দা ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখলের চেষ্টা চলে আসছে। সর্বশেষ হামলার ঘটনা সেই পুরনো বিরোধেরই নতুন অধ্যায় কি না— তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাড্ডা ক্লিনিকের জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত সাম্প্রতিক নয়। ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলেও জমিটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়েছিল। ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
পরবর্তী সময়ে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারি প্রক্রিয়ায় রাড্ডা ক্লিনিকের জমি ইজারা নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে। সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, ২০০৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে জমিটি সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।
জমির মালিকানা ও বরাদ্দ নিয়ে অতীতের এই দাবি এবং বর্তমান হামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না— তা তদন্তের বিষয়। তবে পুরনো ঘটনাগুলো নতুন করে সামনে আসায় রাড্ডা ক্লিনিকের জমি ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সর্বশেষ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। হামলাকারীদের জড়ো করা, দেশীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সকাভেটর আনার সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে আগামীর সময়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলার প্রধান ও একমাত্র নামধারী আসামি শাহ আলী থানা বিএনপির সাবেক সদস্য মো. হানিফ মিয়া। তিনি মিষ্টির অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তার দাবি, রাজনৈতিক কোন্দল ও দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না বলেও দাবি করেছেন।
ভাঙচুরের ঘটনায় গতকাল সোমবার বিকাল পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি হানিফ মিয়াকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
শাহ আলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রাজীব হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, ডিবিসহ বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
ধ্বংসস্তূপেও থামেনি চিকিৎসা
হামলার এক দিন পর থেকেই রাড্ডা ক্লিনিকের কর্মীদের দেখা গেছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে। গতকালও খোলা আকাশের নিচে টেবিল-চেয়ার পেতে রোগীদের সেবা দিয়েছেন তারা। টিকাদান কার্যক্রমও চলেছে।
চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের কাছে এই দৃশ্য যেমন স্বস্তির, তেমনি বেদনারও। কারণ, যাদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসছে, তাদের অনেকেরই বিকল্প চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
গত রবিবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসেছিলেন মনোয়ারা বেগম। কিন্তু ক্লিনিকের ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে আসা মানুষের ভিড় দেখে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি। আগামীর সময়কে মনোয়ারা বললেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষ এখন কোথায় যাবে? এটি আমাদের গরিবের হাসপাতাল ছিল, তাও ভেঙে দিয়েছে।’
মিরপুর-১-এর বাসিন্দা রুহি আক্তার ছয় মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন টিকা দিতে। ঘটনার পর টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু এসে দেখেন, রোদে টেবিল-চেয়ার পেতে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
রুহি বলেছেন, ‘এতে আমাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে তারা পরিস্থিতির মধ্যেও ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছে, এটি খুবই ভালো।’
আরেক শিশুর অভিভাবক হাফসা বেগমের কথায়ও উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থার চিত্র। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বেশিরভাগ সময় এখানেই চিকিৎসা নিতে আসি। এখানে খরচ কম এবং তারা দায়িত্ব নিয়ে রোগীদের সেবা দেয়।’
এই কথাগুলোই যেন বলে দেয়, রাড্ডা ক্লিনিকের ক্ষতি শুধু একটি ভবন বা স্থাপনার ক্ষতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসার সুযোগ, শিশুদের টিকাদান এবং দীর্ঘদিনের নির্ভরতার সম্পর্ক।
আসকের নিন্দা, দাবি নিরপেক্ষ তদন্তের
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল এক বিবৃতিতে সংস্থাটি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিরপুরের ঘটনাটি শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের বিষয় নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ৫০ লাখ টাকা দেবে জামায়াত
ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন শেষে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান এ ঘোষণা দেন। তিনি জানালেন, প্রাথমিক সহায়তার পরও প্রয়োজন হলে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও সহযোগিতা করা হবে।
শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের প্রাথমিকভাবে ঘোষণা করা সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এটি দিয়ে শুরু, তবে শেষ নয়। প্রয়োজনে এই এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য আরও যদি কিছু করতে হয়, তাহলে আমরা করব।’
ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় অপকর্ম করার সাহস কেউ পেত না। দেশ জুড়ে মব সন্ত্রাস বন্ধে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।






