বিড়ালের আঁচড়েও বাড়ছে জলাতঙ্কের রোগী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বদুর রহিম মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শুয়ে আছে। তিন বছরের শিশুটির গায়ে গোলাপি রঙের কাঁথা। দেখে মনে হয় ঘুমাচ্ছে। ঘুমিয়ে নয়, রহিম আসলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। নড়াচড়া করতে পারে না, খেতে পারে না। স্যালাইন চলছে। কুকুরের কামড় খেয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এই হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি।
ওয়ার্ডের কর্তব্যরত নার্স বলছেন, শিশুটির অবস্থা ভালো নয়। একদম সাড়া দেয় না। বেশ কিছু পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে, ফলাফল পেলে বোঝা যাবে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে কি না।
কুকুর-বিড়ালের কামড়ের পর সময়মতো টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে জলাতঙ্কে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু সেই প্রতিরোধযোগ্য রোগেই দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। শৌখিনভাবে কুকুর-বিড়াল পালন বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ঘটনা আরও বেশি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কম বয়সী শিশুরা।
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। জলাতঙ্কের সাম্প্রতিক চিত্রও উদ্বেগের। ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৫৮ এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনে দাঁড়ায়। চলতি বছরের (২০২৬) প্রথম ৮ মাসে ৩৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে মৃত্যুর সংখ্যা কমার বদলে বাড়তির দিকে।
জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল হচ্ছে সরকার নির্ধারিত হাসপাতাল, যেখানে টিকা দেওয়া হয় ও রোগী ভর্তি করা হয়। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান বলছেন, মাঝে টিকার ঘাটতি ছিল। আবার বাড়িতে বিশেষ করে শহর এলাকায় কুকুর-বিড়াল পোষার হারও বেড়ে গেছে। তাতে রোগী বাড়ছে। তবে দেরি করে হাসপাতালে আসা এবং সঠিকভাবে টিকা না নেওয়ায় পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, কুকুর কামড় দিলে যেভাবে মানুষ গুরুত্ব দেয়, অনেক সময়ই বিড়ালের কামড়ের ক্ষেত্রে অবহেলা করে। ‘কিছু হবে না’ ভেবে টিকা নেয় না। অনেকে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর চিকিৎসায় আগ্রহী হয়। বিড়ালের কামড়ের পর সময়মতো টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে জলাতঙ্কে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ বছরের মোহাম্মদ ইয়াসিন বিড়ালের কামড় খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। শিশুটি নিজের জিহ্বায় কামড় দিয়ে কেটে ফেলেছে। ওর মা বুকের মধ্যে নিয়ে বসে আছেন। বিড়াল কামড় দেওয়ার ২৪ দিন পর হাসপাতালে আনা হয়েছে সিরাজগঞ্জের এই শিশুটিকে। তার মধ্যে জলাতঙ্কের সব লক্ষণ দেখা দিয়েছে বলে জানালেন চিকিৎসক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা কুকুর-বিড়ালের আচরণ সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে কম সচেতন। খেলতে গিয়ে, কুকুর-বিড়ালকে আদর করতে বা খাবার দিতে গিয়ে তারা আক্রান্ত হয়। এর সঙ্গে রয়েছে শারীরিক ঝুঁকিও। উচ্চতার কারণে বড়দের তুলনায় শিশুদের মাথা ও ঘাড়ে কুকুরের কামড় লাগার আশঙ্কা বেশি। ফলে একই কামড় শিশুর ক্ষেত্রে বেশি গুরুতর হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জলাতঙ্কে মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা। ২০২০ সালে হেলিয়ন জার্নালে প্রকাশিত ‘মৌখিক ময়নাতদন্তের মাধ্যমে বাংলাদেশে মানুষের জলাতঙ্কের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ওপর মহামারী তাত্ত্বিক গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, মৃতদের ৪৭ দশমিক ২৭ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের কম। অর্থাৎ জলাতঙ্কে মৃত্যুর ক্ষেত্রে শিশুরাই বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। মৃতদের ৮০ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিলেন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। আর ৮১ দশমিক ৬৪ শতাংশের ক্ষেত্রে কুকুরের কামড় ছিল জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার কারণ।
গবেষণাটিতে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে জলাতঙ্কে মারা যাওয়া ২৫৬ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। মৃতদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে রোগীর বয়স, কামড়ের ধরন, প্রাণীর ধরন, চিকিৎসা নেওয়া এবং টিকা গ্রহণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ বিষয়ে এফ এ আসমা খন বলছেন, হাসপাতালে নারী ও শিশুরা বেশ আসছে। সবচেয়ে বেশি আসে শিশুরা। এখন বিড়ালের কামড় নিয়ে রোগী আসার সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি আরও বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি শতভাগ প্রাণঘাতী। কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষত সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে দ্রুত টিকা নিতে হবে।
চলতি বছরের মে পর্যন্ত টিকার সংকট ছিল। ফলে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি হাসপাতালে টিকা না পেয়ে অন্যত্র যেতে হয়েছে বা বেসরকারি উৎস থেকে টিকা কিনতে হয়েছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে টিকা পেলেও বেসরকারিভাবে খরচ ২ হাজার ৫০০ টাকা। অনেক দরিদ্র পরিবার জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ করার আগে টিকা দিতে চান না। এতে চিকিৎসা দেরিতে শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এখন অবশ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে টিকা কিনে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেকে টিকার কোর্স শেষ করে না, এতে ঝুঁকি বাড়ে। চলতি বছর ঢাকার জাতীয় জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ টিকার কোর্স শেষ করেছে। দূরত্ব, সচেতনতার ঘাটতি এবং নিয়মিত ফলোআপের অভাবের সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত ছিল।



