অন্যের আনন্দেই যাদের আনন্দ

ছবি: আগামীর সময়
সদরঘাট, গাবতলী কিংবা কমলাপুরের উপচেপড়া ভিড় ঠেলে লাখো মানুষ যখন নাড়ির টানে ঘরে ফিরছে, তখন একদল মানুষের চোখে ভাসে না ফেরার বেদনা। কেউ রিকশার প্যাডেলে বন্দি জীবিকার তাগিদে, কেউ খাকি পোশাকে দাঁড়িয়ে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, আবার কেউ ঝাড়ু হাতে ব্যস্ত নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে।
যখন প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে মেতে ওঠে পুরো দেশ। তখন রাজধানীর কংক্রিটের নগরে কর্তব্যের দায় কাঁধে নিয়ে থেকে যান মো. বাদল, কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম কিংবা আমিনা বেগমের মতো মানুষরা। অন্যের উৎসবকে নির্বিঘ্ন ও আনন্দময় করে তুলতেই যেন তাদের নিজের ঈদ হারিয়ে যায় নীরব ত্যাগের আড়ালে।
কামরাঙ্গীরচর থেকে প্রতিদিনের মতোই রিকশা নিয়ে বের হন মো. বাদল। ঈদকে ঘিরে রাজধানী থেকে মানুষের বাড়ি ফেরার চাপ বাড়ায় কয়েক দিন ধরে তার কাজও বেড়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের পৌঁছে দিচ্ছেন বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট কিংবা রেলস্টেশনে।
বাবা-মা আর বেঁচে নেই। তবে ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন সবাই গ্রামেই আছেন। তাদের খুব মনে পড়ে, কিন্তু ঈদের সময়ও দেখা করতে যেতে পারি না। দুই-তিন বছর পরপর একবার যাওয়া হয়
তবে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখলেই মনে পড়ে নিজের গ্রামের কথা। পটুয়াখালীর গলাচিপায় তার পৈতৃক বাড়ি। স্ত্রীকে নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে একটি ছোট বাসায় থাকেন। একসময় একটি মুদির দোকান ছিল তার। সংসারও চলছিল মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে। কিন্তু ব্যবসায় লোকসানের পর জীবিকার জন্য বেছে নিতে হয় রিকশা চালানোর পেশা।
কথা হয় বাদলের সঙ্গে। জানালেন, ‘বাবা-মা আর বেঁচে নেই। তবে ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন সবাই গ্রামেই আছেন। তাদের খুব মনে পড়ে, কিন্তু ঈদের সময়ও দেখা করতে যেতে পারি না। দুই-তিন বছর পরপর একবার যাওয়া হয়। যাতায়াতে খরচের কারণে আমি আর আমার স্ত্রী ঢাকায় ঈদ করি। বাড়ি যেতে যে টাকা লাগবে, সেই টাকা দিয়ে প্রায় দুই মাস সংসার চালানো সম্ভব। তাই কষ্ট হলেও কিছু করার নেই।
ঈদ মানেই অধিকাংশ মানুষের কাছে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ। ছুটি, টিকিট আর যাত্রার প্রস্তুতি ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কিন্তু সেই উৎসবের বাইরেও থেকে যায় একদল মানুষ, যাদের জীবনে ঈদের আগের ব্যস্ততা মানে বাড়ি ফেরার নয়, বরং কাজের চাপ আরও বেড়ে যাওয়া।
বাড়িতে তিনটা পোলাপাইন পথ চেয়ে রইছে। ঈদের দিন সকালে বাড়িতে পায়েস খাওয়াটা আমার বাঁধা নিয়ম। এবারও সেই পায়েসের স্বাদ মিস করব। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগবে গ্রামের চেনা ঈদগাহ মাঠে বাবা, ভাই আর স্বজনদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে না পারা
পুরান ঢাকার ব্যস্ত তাঁতীবাজার মোড়ে তখন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম। তার বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায়। সেখানে ঈদের অপেক্ষায় আছে তার তিন সন্তান।
যখন চারদিকে মানুষ শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। তখন সাইফুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন সড়কে। পেশাগত কারণে টানা তিনটি ঈদ পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ হয়নি তার। প্রতি বছরই ছুটির আবেদন করেন, কিন্তু দায়িত্বের প্রয়োজনেই তা মঞ্জুর হয় না।
ডিউটিরত অবস্থায় তিনি বলেছেন, ‘বাড়িতে তিনটা পোলাপাইন পথ চেয়ে রইছে। ঈদের দিন সকালে বাড়িতে পায়েস খাওয়াটা আমার বাঁধা নিয়ম। এবারও সেই পায়েসের স্বাদ মিস করব। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগবে গ্রামের চেনা ঈদগাহ মাঠে বাবা, ভাই আর স্বজনদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে না পারা। এই কষ্টটা ভাষায় বোঝানো যাবে না।’
পোলাপাইন গ্রাম থাইকা ফোন কইরা কান্দে, কয়— ‘মা, ঈদের দিন কেন আসবা না?’ কিন্তু আমাগো তো ছুটি নাই। মন খারাপ হইলেও যখন দেখি আমাগো ঝাড়ুর টানে ঢাকা শহরটা পরিষ্কার হইয়া আসতাছে, মানুষ শান্তিতে যাতায়াত করতাছে, তখন বুকটা ভইরা যায়। এইডাই আমাগো ঈদের আনন্দ
ঈদের দিন সকালে ডিউটির ফাঁকে কাছের একটি মসজিদে নামাজ আদায় করবেন তিনি। এরপর আবার ফিরে আসতে হবে কর্মস্থলে। তবে ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে মানুষের নিরাপদ যাত্রাকেই বেশি গুরুত্ব দেন সাইফুল।
মৃদু হেসে বললেন, ‘চাকরিটা যখন নিয়েছিলাম, তখন এসব জেনেশুনেই নিয়েছিলাম। নিজের একটু কষ্ট হলেও আমাদের কারণে লাখ লাখ মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছে, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করতে পারছে— এটা ভাবতেই ভালো লাগে। তখন আর নিজের কষ্টটা বড় মনে হয় না।’
ঈদের সকালেও বিশ্রামের সুযোগ নেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী আমিনা বেগমের। ভোর থেকেই ঝাড়ু আর বর্জ্যবাহী গাড়ি নিয়ে নেমে পড়তে হবে ঢাকার রাস্তায়।
নিজের ঈদের গল্প বলতে গিয়ে বলেছেন, “পোলাপাইন গ্রাম থাইকা ফোন কইরা কান্দে, কয়— ‘মা, ঈদের দিন কেন আসবা না?’ কিন্তু আমাগো তো ছুটি নাই। মন খারাপ হইলেও যখন দেখি আমাগো ঝাড়ুর টানে ঢাকা শহরটা পরিষ্কার হইয়া আসতাছে, মানুষ শান্তিতে যাতায়াত করতাছে, তখন বুকটা ভইরা যায়। এইডাই আমাগো ঈদের আনন্দ।”
ঈদের ছুটিতে যখন বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট আর রেলস্টেশনের ভিড় ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসে, তখনো দায়িত্বের জায়গা ছেড়ে যেতে পারেন না এই মানুষগুলো। তাদের ঈদে নেই দীর্ঘ সফর, নেই পরিবারের সঙ্গে উৎসবের কোলাহল। তবু অন্যের নিরাপত্তা, স্বস্তি আর আনন্দ নিশ্চিত করার মধ্যেই তারা খুঁজে নেন নিজেদের উৎসবের মানে। কারণ, অন্যের আনন্দেই যাদের আনন্দ, তাদের ঈদও সেখানেই।










