কোরবানির ঈদে সুস্থ থাকতে দিনে কী পরিমাণ মাংস খাবেন?

সংগৃহীত ছবি
কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো মাংস। ঈদের দিন থেকে শুরু করে কয়েক দিন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি খাবারের টেবিলে থাকে গরু বা খাসির মাংসের নানা পদ। তবে আনন্দের এই উৎসবে অতিরিক্ত মাংস খাওয়া অনেক সময় ডেকে আনতে পারে হজমের সমস্যা, গ্যাস, অম্বল, উচ্চ কোলেস্টেরল কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি। তাই প্রশ্ন হলো, সুস্থ থাকতে একজন মানুষ দিনে ঠিক কতটুকু মাংস খেতে পারেন?
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, মাংস খাওয়া বন্ধ নয়, বরং পরিমিত ও সচেতনভাবে খাওয়াই হলো সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
লাল মাংস কেন উপকারী?
গরু ও খাসির মাংস উচ্চমানের প্রোটিনের অন্যতম উৎস। এ ছাড়া এতে রয়েছে আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন বি১২, বি৬ ও বি৩। এসব উপাদান শরীরের পেশি গঠন, রক্ত তৈরি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বলছে, লাল মাংস আয়রন ও ভিটামিন বি১২-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক। তবে লাল মাংসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই অতিরিক্ত খেলে ওজন বৃদ্ধি, হৃদরোগ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দিনে কতটুকু মাংস খাওয়া নিরাপদ?
দেশীয় পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ স্বাভাবিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত লাল মাংস খেতে পারেন। তবে এই পরিমাণ একবারে না খেয়ে সকাল, দুপুর ও রাতে ভাগ করে খাওয়াই ভালো।
একই দিনে যদি ডিম, মুরগি বা অন্য কোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া হয়। তাহলে লাল মাংসের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনা উচিত।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য সতর্কতা
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো ক্লিনিকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্টিফেন কোপেকি বলেছেন, অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়া খারাপ কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দিনে ৬০ থেকে ৯০ গ্রাম মাংসের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা।
মাংসের সঙ্গে সবজি খাওয়া কেন জরুরি?
ঈদের সময় অনেকের খাবারের তালিকায় মাংস থাকলেও সবজির উপস্থিতি থাকে খুবই কম। অথচ হজম ভালো রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে সবজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ৫০ গ্রাম মাংসের সঙ্গে অন্তত ১০০ গ্রাম সবজি বা সালাদ স্বাস্থ্যকর রান্নার কিছু সহজ কৌশল
মেরিনেট করুন: মাংস রান্নার আগে লেবুর রস, টকদই, আদা বা রসুন দিয়ে মেরিনেট করলে তা সহজপাচ্য হয়।
কম তেল ব্যবহার করুন: অতিরিক্ত তেল, ঘি ও মাখন ব্যবহার কমানো উচিত।
রান্নার ধরন বদলান: কালাভুনা বা অতিরিক্ত ভাজাভুজির পরিবর্তে গ্রিল, স্টিম, স্যুপ বা স্ট্যু পদ্ধতিতে রান্না করা ভালো।
স্বাস্থ্যকর পানীয় বেছে নিন: খাবারের পর কোমল পানীয়ের বদলে ঘোল, বোরহানি, জিরাপানি বা ডাবের পানি পান করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: হজম ভালো রাখতে এবং শরীরকে সতেজ রাখতে সারা দিন পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
একনজরে নিরাপদ পরিমাণ: সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক: ২৫০-৩০০ গ্রাম, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী: ৬০-৯০ গ্রাম, কিডনি রোগী: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী
কোরবানির ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা ঠিক নয়। পরিমিত মাংস, পর্যাপ্ত সবজি, স্বাস্থ্যকর রান্না এবং পর্যাপ্ত পানি পান— এই চারটি বিষয় মেনে চললে ঈদের খাবারও উপভোগ করা যাবে। আবার সুস্থও থাকা যাবে। মনে রাখতে হবে, মাংসের উপকারিতা তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন সেটি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সঠিক পরিমাণে খাওয়া হবে।






