২২ ট্রাইব্যুনালের সামনে দেড় লাখ মামলার পরীক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাদক মামলার ভারে ভারী দেশের আদালত। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে চার লাখ। একটি মামলা চলছে ২২ বছর ধরে, সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বছরের পর বছর থমকে আছে বিচার। এমন বাস্তবতায় মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শুধু নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেই মামলার পাহাড় সরবে না। নিয়মিত শুনানি, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা, দক্ষ প্রসিকিউশন টিম এবং মামলার নথি ব্যবস্থাপনায় গতি না আনতে পারলে নতুন ব্যবস্থাও পুরনো জটের মধ্যেই আটকে যেতে পারে। ফলে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মামলা নতুন ট্রাইব্যুনালে কীভাবে দ্রুত স্থানান্তর হবে এবং সেগুলোর বিচার কতটা গতিশীল হবে— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের চলমান মামলাগুলো নতুন ট্রাইব্যুনালের আওতায় যাবে। বর্তমানে বিচারাধীন ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৬টি মাদক মামলার মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩টি— অর্থাৎ ৩৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ মামলা এসব ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে মামলাগুলো বর্তমান আদালত থেকে নতুন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে হবে। তবে মামলাগুলো নতুন করে শুরু করতে হবে না। যে মামলাটি যে পর্যায়ে রয়েছে, নতুন ট্রাইব্যুনালে ঠিক সেই পর্যায় থেকেই বিচার কার্যক্রম চলবে।
২২ বছরেও শেষ হয়নি একটি মামলা
মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতার একটি চিত্র পাওয়া যায় রাজধানীর হাজারীবাগের একটি মামলায়। ২০০২ সালের ২০ মে তিন গ্রাম হেরোইনসহ ২৫ বছর বয়সী রেহেনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দুই বছর পর, ২০০৪ সালে শুরু হয় বিচার।
মামলায় সাক্ষী পাঁচজন। কিন্তু ১৬ বছরের বেশি সময়ে সাক্ষ্য দিতে পেরেছেন মাত্র তিনজন। সাক্ষী হাজির না হওয়ায় ২০২২ সালের ১৭ আগস্ট থেকে মামলাটির বিচার কার্যত বন্ধ। প্রায় ২২ বছর ধরে চলা এই মামলার এক আসামি জামিনে গিয়ে ৯ বছর ধরে পলাতক। ফলে মামলাটির শেষ কোথায়, সেটিও এখন অনিশ্চিত। একটি মামলার এই চিত্রই যেন দেশের হাজার হাজার মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতার প্রতিচ্ছবি।
আট বছরে মামলা বেড়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সারা দেশে বিচারাধীন মাদক মামলা ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৪টি। আট বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৬টিতে। অর্থাৎ এ সময়ে মামলা বেড়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ১৮২টি। গত ৩ মাসে ১৬ হাজার ২৬০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে আরও ২৩৬টি মামলা। নতুন ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার মতো মামলার চাপ সবচেয়ে বেশি ঢাকা মহানগরে। এখানে রয়েছে ২১ হাজার ৯২০টি মামলা। ঢাকা জেলায় আরও ৫ হাজার ৫৮৭টি। মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ঢাকায় এমন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৫০৭টি। এর পরেই চট্টগ্রাম। মহানগর ও জেলা মিলিয়ে সেখানে মামলা ১৯ হাজার ৩২৮টি। কক্সবাজারে রয়েছে ১২ হাজার ৬০০ এবং কুমিল্লায় ১০ হাজার ৪৬৪টি মামলা। নারায়ণগঞ্জে ৭ হাজার ৪৩১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫ হাজার ৯২৭, রাজশাহীতে ৫ হাজার ১২৬ এবং যশোরে ৩ হাজার ৯৮২টি মামলা রয়েছে। জয়পুরহাটে ২ হাজার ৯১৭, নওগাঁয় ২ হাজার ৮৬১, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৭৮০ এবং লালমনিরহাটে ২ হাজার ৬৮২টি মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুর মহানগরে ২ হাজার ৬২৩, পাবনায় ২ হাজার ৫৯১, সিরাজগঞ্জে ২ হাজার ৫০৯, রংপুরে ২ হাজার ৪২৫, কুড়িগ্রামে ২ হাজার ৪০৮, বগুড়ায় ২ হাজার ৩২৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ হাজার ২৮৩ এবং নাটোরে ২ হাজার ১৩টি মামলা রয়েছে।
সীমান্ত ও পাচারের রুটে মামলার চাপ
মাদক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুট ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়ও মাদক মামলার চাপ স্পষ্ট। লালমনিরহাটে ২ হাজার ৬৮২, কুড়িগ্রামে ২ হাজার ৪০৮ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ হাজার ২৮৩ মামলা রয়েছে। বান্দরবানে ৬২৯, রাঙামাটিতে ৫৯২, খাগড়াছড়িতে ২১৭ এবং পঞ্চগড়ে ১৬৭টি মামলা রয়েছে। এর বাইরে ফরিদপুরে ১ হাজার ৭৯১, শেরপুরে ১ হাজার ৫১৩, দিনাজপুরে ১ হাজার ৪৪৮, ঝিনাইদহে ১ হাজার ৩৭৫, টাঙ্গাইলে ১ হাজার ৩৬৮, সাতক্ষীরায় ১ হাজার ২৪২, খুলনা মহানগরে ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ১৪৪ এবং মুন্সীগঞ্জে ১ হাজার ১৩৫টি মামলা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জে ১ হাজার ১২১, গাজীপুরে ১ হাজার ১১৩, বরিশাল মহানগরে ১ হাজার ২১, ঠাকুরগাঁওয়ে ১ হাজার ১২, হবিগঞ্জে ৯৮৭, জামালপুরে ৯৫৩, সিলেটে ৮৬৩, রাজশাহী মহানগরে ৮২১, সিলেট মহানগরে ৮১৪ এবং সুনামগঞ্জে ৭০৪টি মামলা রয়েছে। তুলনামূলক কম মামলা রয়েছে মাগুরায় ৪৬১টি, বরগুনায় ৪৪৫, পটুয়াখালীতে ৪০৩, গোপালগঞ্জে ৩৯৩, বাগেরহাটে ২৮৯, শরীয়তপুরে ২৭৯, পিরোজপুরে ২০০, নড়াইলে ১৪৯, মাদারীপুরে ১৩৬, লক্ষ্মীপুরে ১০৮, ভোলায় ৭৯, খুলনায় ৭৪ এবং নেত্রকোনায় ৬৭টি। সবচেয়ে কম মামলা রয়েছে ঝালকাঠিতে— মাত্র আটটি।
শুধু ট্রাইব্যুনাল নয়, দরকার দক্ষ প্রসিকিউশন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, শুধু ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। যোগ্য আইনজীবীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রসিকিউশন গঠন করা হলে অনিয়মের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ট্রাইব্যুনালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা। কারণ বছরের পর বছর মামলার তারিখ পড়লেও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় অনেক মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণই শেষ হয় না। ফলে বিচারও ঝুলে থাকে।
ব্যারিস্টার নাসির উদ্দীন আহমেদ অসীম আগামীর সময়কে বলেছেন, মাদক মামলার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ভালো উদ্যোগ। তবে এর সুফল পেতে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রসিকিউশন টিম গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, সাক্ষীরা নিরাপদ বোধ না করলে কিংবা আদালতে আসার যাতায়াত ব্যয় নিশ্চিত না হলে নিয়মিত সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে এখনো ১৯০৮ সালের আইন কার্যকর থাকা দুঃখজনক। দ্রুত বিচার যে সম্ভব, শিশু আছিয়া ধর্ষণ মামলার উদাহরণ টেনে সেটিও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ওই মামলার বিচার ২১ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করে দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
আগেও ছিল আলাদা ট্রাইব্যুনালের উদ্যোগ
মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছিল। আইনের ৪৪ ধারায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়। ৪৫ ধারায় এসব ট্রাইব্যুনালের গঠন, এখতিয়ার ও কার্যক্রম নির্ধারণের কথা ছিল। সেশন আদালতের মতো ক্ষমতা দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছিল।
কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। পরে ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর সংশোধিত আইনে মাদক মামলা বিচারের ক্ষেত্রে ‘ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা ট্রাইব্যুনাল’ শব্দ বাদ দিয়ে ‘এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত’ যুক্ত করা হয়। এবার আবার ২২টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার।





