ফিরেছে ব্যানার, ধ্বংসস্তূপে ফের দাঁড়াচ্ছে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকার মিরপুরে দখলের চেষ্টায় গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে দখলদারদের ব্যানার সরিয়ে তোলা হয়েছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ব্যানার।
গত বৃহস্পতিবার একদল ব্যক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ করেনি বিদেশি সহযোগিতায় পরিচালিত বেসরকারি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই চলছিল শিশুদের টিকাদান।
আজ সোমবার সকালে কেন্দ্রটির ফটকে আবার নিজস্ব ব্যানার টানানো হয়। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজও চলে। মেরামতের মধ্যেও অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আক্তার আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখন আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দখলমুক্ত রয়েছে। গেটটি খুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা পুনরায় আমাদের ব্যানার টানিয়েছি। ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার ও নতুন করে নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি একটি কক্ষ পরিষ্কার করে টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছি।’
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যালয়ে হামলা হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পেছন দিক দিয়ে ঢুকে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভাঙচুরের পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফটক।
সুইনের সংস্থা রাড্ডা বারনেনের (সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেন) সহায়তায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দিতে ১৯৭৪ সালে গড়ে তোলা হয় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। ঢাকার মিরপুরে তাদের কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে।
তার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয় ডি ব্লকে ১০ কাঠা জমিতে ১৯৭৬ সালে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের জায়গাটি ১৯৮৪ সালে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় সরকারি টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য।
তবে এই জমিটি দখল করতে আগে থেকে তৎপর ছিল স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার ধারাবাহিকতায় এবারও হামলা হয়।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই টিকাদান
ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর শুক্র ও শনিবার টিকাদান কর্মসূচি চলে। ফটকের সামনে টেবিল-চেয়ার ও ত্রিপল টাঙিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি টিকা নিতে আসা শিশু ও তাদের অভিভাবকদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
গত শনিবার টিকাদান কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালন করা প্যারামেডিক মোছা. ফারজানা আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা সেবা দিয়ে যাব।
‘যেহেতু এখানে মাসব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চলার কথা ছিল, তাই আমাদের প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকেই আজ ধ্বংসস্তূপের বাইরে টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছি।’
আজ সোমবার টিকাদান কর্মসূচিতে দায়িত্বে থাকা এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেছেন, ‘গত দুই দিনের তুলনায় আজ আমাদের শিশু ও মায়েদের জন্য একটু স্বস্তি হচ্ছে। আমরা আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকতে পারছি। ওপরে অন্তত ছাদ আছে। স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের আরও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’
সমিতির ব্যানার নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারটি কারা লাগিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানালেন, এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। সেখানে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) নামও আলোচনায় আসে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ এই হামলার ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।
ব্যানারে সমিতির ঠিকানা লেখা ছিল— মিরপুর ১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন বৈশাখী সুপার মার্কেট।
এই সূত্র ধরে গত শনিবার দুপুরে ওই মার্কেটের চতুর্থ তলায় গিয়ে পাশাপাশি থাকা দুটি দোকানের ওপর সমিতির নাম লেখা দেখা যায়। একটি দোকান বন্ধ ছিল। অন্য দোকানে থাকা একজন জানালেন, এই নামে কোনো সংগঠন তিনি চেনেন না।
পাশের দোকানিরাও জানান, সমিতির নাম লেখা কক্ষটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। মাঝেমধ্যে কয়েকজন এসে সেখানে বৈঠক করেন।
মো. বাবুল নামে এক দোকানির দোকানের ওপর ঝুলছিল সমিতির নাম। বাবুল বলেছেন, তিনি সম্প্রতি দোকানটি ভাড়া নিয়েছেন। তাই আগের ব্যানার খোলা হয়নি।
এর আগে দোকানটি কোনো কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো কি না, তা বাবুল জানেন না। যার কাছ থেকে দোকানটি ভাড়া নিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে বলতে পারবেন বলে জানালেন তিনি।
বৈশাখী মার্কেটের যার থেকে বাবুল দোকানটি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার নাম মো. সাকের। মোবাইলে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেছেন, আগে যারা দোকানটি ব্যবহার করতেন, তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য তার কাছে নেই।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলার পর বিভিন্ন দল ও সংগঠন প্রতিবাদের মুখর হয়ে ওঠে। গতকাল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা সমিতির লাগানো সাইনবোর্ডটি উপড়ে ফেলেন।
এজাহারে হামলার বর্ণনা
হামলার পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার শাহআলি থানায় একটি মামলা করেন।
এজাহারে বলা হয়, রাত ১২টার দিকে ২০০-২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রাচীর টপকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, হামলাকারীরা মূল ফটক ভেঙে ভবন ভাঙার ভারী যন্ত্র দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সব কটি কক্ষে ভাঙচুর চালান। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যান।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত
হামলার খবর পুলিশ পেলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এসেও হামলাকারীদের থামায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এনিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছিলেন, দায়িত্বে অবহেলা থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরপর শাহ আলি থানার ওসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বললেন, ‘অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধী সে অপরাধীই।’





