এখনো সরকারি দলের লোক চাঁদাবাজি করে
- নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সেমিনারে সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান

‘আমি চাঁদাবাজি এলাকার সংসদ সদস্য। আমার নির্বাচনী এলাকার মধ্যে শুধু কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন গড়ে ২-৩ কোটি টাকা চাঁদা দিতে হয়। শুধু কয়েকটি মুরগির পাইকারি দোকান থেকে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।’
এই অকপট স্বীকারোক্তি ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খানের। গতকাল সোমবার এক জনাকীর্ণ সেমিনারে তিনি বলেছেন, এই চাঁদা আদায়ে নিচে থাকে কর্মী, ওপরে থাকে সরকারদলীয় রাজনৈতিক ছায়া। এটা সরকারদলীয় লোকজন করে। আরও স্পষ্ট করে বলতে চাই, ‘তা হলো আগেও চাঁদাবাজি করত সরকারি দলের লোক, এখনো করে সরকারি দলের লোক।’
তিনি বলছিলেন, ‘এটা তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানতেন। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ও চাঁদার বিষয়ে জানেন।’
রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংলাপের আয়োজন করে। প্রশ্নোত্তরের এই লাইভ অনুষ্ঠানে খোলাখুলি এসব কথা বলেন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা হাবীবা সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ করে বললেন, চাঁদাবাজির কথা ঢালাও না বলে চাঁদাবাজদের নাম বলেন। জবাবে সাইফুল আলম বললেন, ‘নাম প্রকাশ করলাম না ভদ্রতার খাতিরে। কেননা, আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী কারওয়ান বাজারের চাঁদার ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করেন। তিনি বলেছেন, এটা নিয়ে কথাবার্তা না বলাই ভালো হবে। সরকারের সবাই চাঁদার বিষয় জানেন। চাঁদা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
সাইফুল আলম জানালেন, চাঁদাবাজি নিয়ে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন, চাঁদাবাজি বন্ধে তার সহযোগিতা চেয়েছেন। একজন মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে পরামর্শ দিয়েছেন।
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বললেন, ‘সরকারের নির্বাচনের ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট হবে। বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য অগ্রাধিকার থাকবে। আর প্রকল্প বাস্তবভিত্তিক করার জন্য চেষ্টা চলছে। প্রকল্প নিরীক্ষা কঠোর করা হবে। মন্ত্রী বা সচিবের দুর্বলতা থাকলে তা জবাবদিহি করা হবে। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তওফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধে বললেন, ‘কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করতে হবে। কালোটাকা সাদা করা একটা পর্যায়ে তেমন কাজ করে না। আয় বাড়াতে নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে।’
এডিপি নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ৯০ শতাংশ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিতে হবে। কর আদায়ের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে প্রকল্প নিতে হবে। কেননা, সরকার পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের মতো কর আয় করতে পারে না; সুতরাং বাজেট বাস্তবমুখী হলে বাস্তবায়ন হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প প্রণয়নে ঘুষের সুযোগ রাখা হয়। এটা মারাত্মক ক্ষতিকর।
অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য স্কুলে টিফিন দেওয়ার কর্মসূচি সম্পর্কে বলেন, ‘নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে কোম্পানি বা ঠিকাদারকে না দিয়ে মা-বাবা ও অভিভাবকদের সংযুক্ত করতে হবে। তারা সন্তানকে ভেজাল খাওয়াবেন না।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বললেন, ‘বাজেট মানে ন্যায় হিসাব করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা ডিসিপ্লিনের বাধা।’
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। বাজেটে বরাদ্দের দাবির পাশাপাশি বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহার নিয়ে সোচ্চার হওয়া জরুরি। কেননা, প্রাক্কলন করার সময় দুর্নীতির সুযোগ থাকে। এসব বন্ধ করতে হবে।’
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. গেইল মার্টিন বললেন, ‘সরকার কয়েক বছর প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় করতে পারে না। তবু বিদেশ থেকে অর্থায়ন সংগ্রহে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছে। সরকারকে জ্বালানি, সার ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ে যৌক্তিক হতে হবে।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলছিলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে। এজন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় দ্রব্যে আমদানি শুল্ক কমানো প্রয়োজন।




