নতুন ভাড়ার তালিকা সরকারি ওয়েবসাইটে, নেই বাসে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০ সেপ্টেম্বর। হঠাৎ ২০ টাকা বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ। পরদিন সোমবার থেকেই কার্যকর। এদিনই গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু করে পরিবহন মালিক সমিতি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে হয় বৈঠকও। ২০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে।
সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশও করা হয় সরকারি ওয়েবসাইটে। সেই তালিকা ঝুলেনি রাজধানীর কোনো বাসে। যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ইচ্ছামতো ভাড়া। এমন অভিযোগ উঠেছে বাসচালক ও হেল্পারদের বিরুদ্ধে।
রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, রামপুরা, বাড্ডা, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও গাবতলী এলাকায় সরেজমিন ঘুরে অধিকাংশ বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা দেখা যায়নি। কোথাও পুরনো তালিকা টানানো থাকলেও আদায় করা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি ভাড়া। হেল্পারদের সঙ্গে যাত্রীদের হচ্ছে বাগ্বিতণ্ডা। নতুন ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলেও যাত্রীদের দেখাতে পারছেন না বাসচালকরা।
‘৩০ টাকার ভাড়া ৪০’
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহানগর এলাকায় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। অধিকাংশ রুটে এর চেয়েও বেশি হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের থেকে, এমন চিত্র দেখা গেল রাজধানীর বাসগুলোতে।
গাবতলী থেকে বসুমতি পরিবহনে গুলিস্তানে আসলেন স্ট্যাম্প ভেন্ডার শাহাদত উল্লাহ। কথা হলো তার সঙ্গে। আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলো কত টাকা দিয়ে আসলেন? জবাবে বললেন— আগে এই পথ ৩০ টাকা দিয়ে আসতাম। এখন আরও বাড়তি ১০ টাকা দিয়ে ৪০ টাকা দিতে হলো।
তার ভাষ্য, ‘সরকার প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়িয়েছে। কিন্তু কম দূরত্বেও ১০ টাকা বেশি নিচ্ছে বাসচালকরা। তবে বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা টানিয়ে রাখলে যাত্রীদের জন্য সুবিধা হতো। যত টাকা লেখা থাকবে, সেটাই যাত্রীরা দিত।
সরেজমিনে কয়েকটি বাসে দেখা যায়, একই দূরত্বের জন্য যাত্রীভেদে ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। কারও কাছ থেকে আগের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আবার কারও কাছে চাওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। বিশেষ করে তুলনামূলক দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ বেশি।
বনশ্রী থেকে আছিম পরিবহনে উঠেন আগামীর সময়ের প্রতিবেদক। বাসটিতে নতুন ভাড়ার তালিকা নেই। ছিল না পুরনো ভাড়ার তালিকাও। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় চালকের কাছে। তালিকা না থাকার ব্যাখ্যা দিয়ে মালিকের ওপর দায় চাপালেন চালকের সহকারী ইলিয়াস আলী।
বললেন, ‘সবকিছু মালিকের বিষয়। আমরা ভাড়ায় গাড়ি চালাই। মালিক পক্ষ থেকে এখনো নতুন চার্ট দেওয়া হয়নি। তাই টানাইনি। চার্ট না থাকায় আমরা সবার কাছ থেকে আগের ভাড়াই নিচ্ছি।’
শাহবাগে সাভার পরিবহনের বাসে ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হেল্পার দূরত্বভেদে আগের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি ভাড়া দাবি করেন। বাসটির চালক মো. জয়নাল বলেন, ‘আমাদের গাড়ি ডিজেলে চলে। সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এজন্য বাস ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। তালিকা মালিকপক্ষ থেকেই দেওয়া হবে।’
‘বাড়তি ভাড়া নিলেই পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল’
সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সার বেশি ভাড়া আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীবাহী পরিবহনের রুট পারমিট স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে— পরিবহন মালিকদের হুঁশিয়ারি করে বলেছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে— তা দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখেন আগামীর সময়ের এই প্রতিবেদক। যেসব বাসে ভাড়ার তালিকা টানানো আছে, সবগুলোই পুরনো তালিকা। আবার ওই তালিকা অনুযায়ী ভাড়া না নিয়ে নতুন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমন চিত্র হরহামেশা হওয়া সত্ত্বেও নজরে আসছে না কর্তৃপক্ষের। নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থাও।
কী বলছেন যাত্রীরা
যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়ার তালিকা প্রকাশ্যে না থাকায় তারা প্রকৃত ভাড়া জানতে পারছেন না। একই পথে একেক সময় একেক রকম ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। বিআরটিএর ওয়েবসাইটে নতুন ভাড়ার তালিকা দেওয়া আছে, সেটিও জানেন না অনেক যাত্রী। শুধু তা-ই নয়, ভাড়ার তালিকা কীভাবে দেখতে হয়, সেটাও জানেন না।
সাইনবোর্ড থেকে আসা লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাসে চালকের আসনের ওপরে পুরনো ভাড়ার তালিকা ঝুলতে দেখা যায়। ওই বাসে মৌচাক থেকে উঠেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী দীপেন ঘোষ। ‘সকালে গাবতলী থেকে একই পথে ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে এসেছেন। ফেরার সময় তার কাছে ৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে।’
বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় ক্ষোভ ঝাড়লেন দীপেন ঘোষ। বললেন, সরকার ওয়েবসাইটে তালিকা ঝুলিয়েছে, কিন্তু এটা দিয়ে লাভ কী? বাসে তালিকা না থাকলে প্রকৃত ভাড়া যাত্রীরা জানবে কীভাবে?
বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকায় শুধু যাত্রী নয়, চালক ও ভাড়া আদায়কারীদেরও প্রকৃত ভাড়া জানতে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তার ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত ভাড়া থাকলেও বাস্তবে যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর আগেও ভাড়া নির্ধারণ ও তালিকা পরিবহনে টানানোর ক্ষেত্রে সময় লেগেছে। প্রযুক্তির যুগেও এখনো সেই পুরনো ব্যবস্থাই চলছে। বাস মালিকদের কাছে দ্রুত নতুন ভাড়ার তালিকা পৌঁছে দেওয়া এবং তা বাসে প্রদর্শন নিশ্চিত করা প্রয়োজন’—যোগ করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব।
নতুন ভাড়ার তালিকা না টানানোর বিষয়ে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সাড়া না দেওয়ায় তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তালিকা না টানালেই ১ মাসের কারাদণ্ড
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। আইনের ৩৪ ধারায় সহজে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন না করে গণপরিবহনে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ নেই। বাসের ভেতরে যাত্রীদের চোখে পড়ে এমন স্থানে ভাড়ার তালিকা ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে এক দোষসূচক পয়েন্ট কেটে নেওয়ার বিধানও রয়েছে।
দেশের ইতিহাসে তেলের সর্বোচ্চ দাম
ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার হলো। এটা দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।





