এমন দিন আর না আসুক

জুলাই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে ‘আয়নাঘর’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ঢুকতেই ডান পাশে চোখে পড়ে ইট দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি বর্গাকৃতির কক্ষ। কোনো রঙ নেই, নেই বাহারি সাজসজ্জা। খোলা ইটের গাঁথুনিই যেন নীরবে বলে দেয়—এটি কোনো সাধারণ প্রদর্শনী নয়। এটি ‘আয়নাঘর’-এর প্রতীকী রূপ।
কৌতূহলী দর্শনার্থীরা একে একে ভেতরে প্রবেশ করছেন। কেউ চারপাশ দেখছেন, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, আবার কেউ প্রতীকী লোহার দরজাটি খুলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেতরে দাঁড়িয়ে অনুভব করার চেষ্টা করছেন বন্দিজীবনের দমবন্ধ বাস্তবতা।
ভেতরে প্রবেশের পর মুহূর্তেই গরম আর অস্বস্তি শরীরকে গ্রাস করতে শুরু করল। চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ বলছেন, এখানে কীভাবে মানুষ থাকত? আরেকজনের কণ্ঠ ভেসে এলো, এক দিন বিদ্যুৎ না থাকলেই তো আমরা হাঁসফাঁস করি। এত ছোট, অন্ধকার ঘরে মানুষ বছরের পর বছর কীভাবে বেঁচে ছিল?
ঠিক তখনই দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যে থেকে কাঁপা গলায় ৩০ থেকে ৪০ বছরের নুরায়না নামের নারী বলে উঠলেন, ‘এমন দিন আর না আসুক’। কথাটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন চারপাশের কোলাহলও থমকে গেল।
রাজধানীর আদাবর থেকে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে জাদুঘর দেখতে এসেছেন ৬০ বছর বয়সী রশিদা বেগম। বয়সের ভারে শরীর ছেড়ে দিয়েছে। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না। এরপরও পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখার পর এসে বসলেন জুলাই গণকবরের পাশে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে গভীর বিষাদ।
তিনি বললেন, ‘পুরো জাদুঘর দেখেছি। কিন্তু এই আয়নাঘর আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে। এতটুকু জায়গায় মানুষ কীভাবে থাকত? এখানেই খাওয়া, এখানেই টয়লেট, এখানেই দিনের পর দিন বন্দিজীবন! আমি হলে এক দিনও বাঁচতে পারতাম না।’
শেওড়াপাড়া থেকে মাকে নিয়ে এসেছেন ৪০ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তার। ধীর পায়ে পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখছিলেন দুজন। আয়নাঘরের সামনে এসে ফাতেমা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন গণভবনে গিয়েছিলাম। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভেতরে ঢুকতে পারিনি। আজ মাকে নিয়ে এখানে এসেছি। এই ছোট্ট ঘরটা দেখে বুঝলাম, মানুষ কত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এতটুকু জায়গায় একজন মানুষ কীভাবে দাঁড়াবে? বসবে কোথায়? ঘুমাবে কোথায়?’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এ যেন বর্তমান যুগে ফেরাউনের শাসন। এত কম জায়গায় একজন মানুষকে আটকে রাখা যায়—নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।’
তিনি আরও বললেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় যখন হেলিকপ্টার থেকে গুলি চলত, তখন বাসায় বসে শুধু কাঁদতাম। আমার ছেলে পুলিশে চাকরি করে। সারাক্ষণ ভাবতাম, ওরা কেমন আছে। তখন এসব নিজের চোখে দেখিনি। আজ জাদুঘর ঘুরে বুঝলাম, বাইরে থেকে যা দেখা যায়, ভেতরের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভয়ংকর।’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে আসা মানুষের চোখে শুধু ইতিহাস দেখার আগ্রহ নেই; আছে শোক, বিস্ময়, ক্ষোভ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটাই প্রত্যাশা—রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন অন্ধকার অধ্যায়ের আর কখনো পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আয়নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাই অনেকের মুখে উচ্চারিত হয় একই বাক্য ‘এমন দিন আর না আসুক’।










