সরকারি চাকরিজীবীদের
ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরিজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মস্পৃহা বাড়াতে বেশ কিছু খাতে ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা বৃদ্ধি এবং পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ-সংক্রান্ত কয়েকটি গেজেট জারি করেছে, যা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
সরকারি কাজের কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরে গিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার অভিযান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ তদন্ত, দুর্গম বনাঞ্চলে কাজ করা কিংবা সমুদ্রসীমা সুরক্ষার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোয় পদে পদে শারীরিক ক্ষতি বা জীবনহানির আশঙ্কা থাকে। কর্মচারীদের এই বিশেষ আত্মত্যাগ ও পেশাগত ঝুঁকিকে মূল্যায়ন করা, তাদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করাই হলো ঝুঁকি ভাতা বা বিশেষ ভাতা প্রদানের মূল উদ্দেশ্য।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর আওতাভুক্ত দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দপ্তর ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগ থেকে জারি করা এ প্রজ্ঞাপনগুলো সম্প্রতি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
গেজেট সূত্রে জানা গেছে, পুনর্নির্ধারিত এই ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বিদ্যমান নিয়মেই তাদের ভাতা পাবেন। নতুন এই আদেশে বলা হয়েছে, নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী ভাতাগুলো মূল বেতনের শতাংশ হিসেবে হিসাব করা হবে না, বরং নির্দিষ্ট অর্থ বা বৃদ্ধির হারে তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গেজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দশম থেকে ১৯তম গ্রেডের কর্মীদের ঝুঁকি ভাতা চাকরির বয়সের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে। যেখানে চাকরির মেয়াদের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মীরা সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫৬০ থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৪৮০ টাকা পর্যন্ত মাসিক ঝুঁকি ভাতা পাবেন। একইভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দশম থেকে ১৮তম গ্রেড পর্যন্ত অপারেশনাল কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চাকরির বয়সভেদে ১ হাজার ৬৮০ থেকে শুরু করে ৬ হাজার ৪৮০ টাকা পর্যন্ত ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডে কর্মরত কর্মীদের জন্য পদভিত্তিক স্থায়ী ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে রিক্রুট পর্যায়ে ১ হাজার ৭৪০ থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে ওডি, এবি, এলএস, পিও, সিপিও, এসসিপিও এবং শীর্ষ পদ এমসিপিওদের জন্য সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮৪০ টাকা পর্যন্ত মাসিক ভাতা প্রদেয় হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মীদের ঝুঁকি এবং বিশেষ ভাতা শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এসব দপ্তরের কর্মীরা যে পরিমাণ ভাতা তুলতেন, তার সঙ্গে আরও ২০ শতাংশ যোগ করে নতুন ভাতার পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে, যা ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
ভাতা পুনর্নির্ধারণের এই আদেশে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনি শর্তও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যেসব কর্মচারী বর্তমানে অন্যান্য বাহিনী বা দপ্তরে প্রেষণে কর্মরত, তারা যদি এই নতুন নির্ধারিত ঝুঁকি ভাতা গ্রহণ করেন, তবে স্ব-স্ব মূল বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য মূল ঝুঁকি ভাতা, বিশেষ ভাতা কিংবা প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ কোনো কর্মচারী কোনো অবস্থাতেই একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন খাতের ঝুঁকি বা বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ খাতের কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার ও কর্মক্ষেত্রে মনোবল উন্নত করতেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রথা তুলে দিয়ে চাকরির বয়স ও পদের ঝুঁকি বিবেচনায় নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাতা নির্ধারণ করায় মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। গেজেট প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে এ আদেশ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার সুফল ২০২৮ সাল থেকে ভোগ করবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।



