সম্পাদকীয়
গভীর সতর্কবার্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুমিল্লার শিশু অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ নয়, এটি সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া ঘটনা। আমাদের সামনে আবারও স্পষ্ট হলো দেশের শিশু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা প্রশ্ন। অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; এ ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্বের জায়গাগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে। আমরাও সম্ভাবনাময় শিশু শিক্ষার্থী অপ্রতিমের এমন মৃত্যুতে শোকাহত।
শিশুদের একটি দেশের সবচেয়ে নিরাপদ নাগরিক হওয়ার কথা। তাদের বেড়ে ওঠা, খেলাধুলা, শিক্ষা ও স্বপ্ন দেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে প্রায়ই শিশু নির্যাতন, অপহরণ, হত্যা, যৌন সহিংসতা ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অহরহ সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। প্রতিবারই আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করি, প্রতিবাদ করি, বিচার দাবি করি; কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু যেন আগের মতো হয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন জাগে— শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা কোথায় ব্যর্থ হচ্ছি?
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় যে নির্মমতা প্রকাশ পেয়েছে, তা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। একটি সমাজ তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন দুর্বল ও অসহায় মানুষের জীবন সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের অংশ। সব জায়গায় সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি থাকলে এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অপ্রতিমের ঘটনায় সংসদে বিরোধী দলও আইনশৃঙ্খলার প্রতি ‘গভীর সতর্কবার্তা’ বলে অভিহিত করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। প্রতিটি ঘটনার পর শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। একটি সমস্যা হলো— শিশু নির্যাতনকে সমাজের অনেকেই বড় অপরাধ হিসেবে দেখতে চান না। শিশুদের আদর-সোহাগ ঠিকই করা হয়, কিন্তু তাদের প্রতি সহিংসতাকে গুরুত্বের সঙ্গে আমল দেওয়া হয় না। এটাকে সাধারণ বা গৌণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রবণতা শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়তে সহায়তা করে। এ অপরাধ দমনে শুধু রাষ্ট্রের দায় দিয়ে বসে থাকলে তা হবে একপক্ষীয়। সন্তান পরিচর্যায় পরিবারের দায় প্রথম, সমাজের দায় কোনো অংশে কম নয়। তাই বলে পরিবার ও সমাজের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
চলতি শতাব্দীর গোড়ার দিকে বা গত দশকেও দেখা গেছে এ জাতীয় অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠার দৃশ্য। সামাজিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের চেয়েও বেশি সোচ্চার হয়েছে, তাদের ইতিবাচক ভূমিকা সমাজে সুন্দর প্রভাব ফেলেছে তখন। তাদের রাজপথে সোচ্চার হওয়ার সেসব ঘটনা এখন স্মৃতি। এখন সামাজিক সংগঠনের আকালই বলা যায়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের অভাবে সমাজে স্থিতিশীলতাও কমার অন্যতম কারণ। এখন অবশ্য প্রতিবাদ হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর প্রভাব সমাজ ও জনমনে বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কতটা পড়ে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সামনে আরও একটি প্রশ্ন তুলে ধরে— শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গঠনের যে অঙ্গীকার আমরা বারবার করি, তার বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু? শহর থেকে গ্রাম, বিদ্যালয় থেকে খেলার মাঠ—সবখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
অপ্রতিমের বিদেহী আত্মার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই যখন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে, যেখানে কোনো বাবা-মাকে আর সন্তানের এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।



