সুরক্ষা ভাবনাতেও ঝুঁকিতে বেসরকারিরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সুরক্ষার কথা ছিল; কিন্তু খসড়া পড়লে দেখা যাচ্ছে উল্টো ছবি! বেসরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটাতে একটি অভিন্ন চাকরি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। নিয়োগপত্র থাকবে, চাকরির শর্ত লিখিত হবে, বেতন সময়মতো দিতে হবে, বৈষম্য করা যাবে না, হয়রানি প্রতিরোধে ব্যবস্থা থাকবে— শুনতে সবই স্বস্তির। এজন্য বেসরকারি চাকরিজীবীদের ‘মডেল চাকুরি প্রবিধানমালা’ নামে একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে সরকার। ওই খসড়া প্রস্তাবের ভেতরের ধারা-উপধারা পড়লে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি সত্যিই বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষা বাড়াবে, নাকি অনেক প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই পাওয়া সুবিধাগুলোকে একটি সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে আটকে দেবে?
বড় উদ্বেগ, খসড়াটি অনেক ক্ষেত্রে ‘ন্যূনতম অধিকার’ নির্ধারণের বদলে ‘সর্বোচ্চ সুবিধা’র সীমা তৈরি করছে। ফলে যে কর্মচারী বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিতে এর চেয়ে ভালো সুবিধা পান, ভবিষ্যতে তার সে সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৬০ ঘণ্টার কাজ— কিন্তু অতিরিক্ত কাজের টাকা কোথায়
খসড়ার ১২ নম্বর প্রবিধানে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টা দৈনিক ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পরের অংশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে অতিরিক্ত কাজ করানো যাবে এবং সাধারণ ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে সপ্তাহে কর্মঘণ্টা ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারবে। অর্থাৎ কাগজে ৪৮ ঘণ্টা, বাস্তবে ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের দরজা খোলা।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই অতিরিক্ত ১২ ঘণ্টার জন্য আলাদা ওভারটাইম পারিশ্রমিকের স্পষ্ট বিধান কোথায়?
খসড়ায় অতিরিক্ত কাজের অনুমতি আছে, কিন্তু এই শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত সময়ের কাজের আলাদা পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে ‘অতিরিক্ত কাজ’ ধীরে ধীরে নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রথম লাইনে বলা হয়েছে, কর্মঘণ্টা দিনে ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা হবে। দিনে ৮ ঘণ্টা করে অফিস করলে ৬ দিন অফিস। আবার বলছে, প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনে যে কাউকে অতিরিক্ত কাজ করাতে পারবে। সেটা সপ্তাহে হবে ৬০ ঘণ্টা। তাহলে প্রথম লাইনের কোনো মানে থাকল না। দিনে ১০ ঘণ্টাই ডিউটি। ‘অফিসের প্রয়োজন পড়বে’ এই ফাঁক রেখে দেওয়া হলো।
ছুটির তালিকা আছে, কিন্তু সুবিধার মান নিয়ে প্রশ্ন
খসড়ায় বছরে ১৩ দিন উৎসব ছুটি, ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, অন্তত ১৪ দিন পীড়া ছুটি এবং অর্জিত ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি কর্মচারীবান্ধব বলেই মনে হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যে অতিরিক্ত ছুটি, বিশেষ ছুটি বা অন্যান্য সুবিধা চালু আছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে— খসড়ায় তা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
বিশেষ করে উৎসব ভাতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ নম্বর প্রবিধানে বলা হয়েছে, একজন কর্মচারী বছরে সর্বোচ্চ দুটি উৎসব ভাতা পাবেন এবং প্রতিটির পরিমাণ মাসিক মূল বেতনের বেশি হবে না।
খসড়ার প্রথম লাইনে বলা হয়েছে কর্মঘণ্টা দিনে ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা হবে। দিনে ৮ ঘণ্টা করে অফিস করলে ছয় দিন অফিস। আবার বলছে, প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনে যে কাউকে অতিরিক্ত কাজ করাতে পারবে
এখানে ‘সর্বোচ্চ দুটি’ শব্দটাই প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি বর্তমানে দুটির বেশি উৎসবভাতা, নববর্ষ ভাতা বা অন্য কোনো উৎসবভাতা দেওয়ার প্রচলন থাকে, তাহলে নতুন প্রবিধানটি কি সে সুবিধা কমানোর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে?
খসড়ার উদ্দেশ্য যদি হয় ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করা, তাহলে ভাষাটি হওয়া উচিত— ‘অন্যূন দুটি’ বা ‘প্রচলিত সুবিধার কম নহে’। কিন্তু ‘সর্বোচ্চ দুটি’ বলা হলে সেটি কার্যত একটি সর্বোচ্চ সীমা তৈরি করে দেয়। এই জায়গাতেই সুরক্ষা আর সুবিধা কমানোর মধ্যে পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বেতন কাঠামো নেই, আছে শুধু ‘যুক্তিসংগত’ বেতন বৃদ্ধির কথা
বেসরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা বেতন কাঠামোর অনিশ্চয়তা। অথচ ২১ নম্বর প্রবিধানে বেতন ও ভাতা মূলত প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২৩ নম্বর প্রবিধানে এক বছর চাকরি পূর্ণ করলে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, কোনো নির্দিষ্ট হার না থাকলে প্রতিষ্ঠানকে শুধু ‘যুক্তিসংগত’ হারে বেতন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, যুক্তিসংগত মানে কত? ৫ শতাংশ? ৩ শতাংশ? ১ শতাংশ? নাকি কোনো বছর শূন্য?
আইনে যদি ন্যূনতম নির্ধারিত না থাকে, তাহলে ‘যুক্তিসংগত’ শব্দটি অধিকারকে কতটা নিশ্চিত করবে, তা স্পষ্ট নয়।
ফলে নিয়োগপত্রে বেতন থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে কর্মচারীর আয় কীভাবে বাড়বে, তার কোনো শক্ত কাঠামো তৈরি হচ্ছে না।
৩৯ নম্বর প্রবিধানে অন্তত ১০০ জন স্থায়ী কর্মচারী থাকলে এবং দুই-তৃতীয়াংশ কর্মচারী লিখিতভাবে দাবি করলে ভবিষ্য তহবিল গঠনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এখানেও একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে। একটি প্রতিষ্ঠানে ৯৯ জন স্থায়ী কর্মচারী থাকলে কী হবে? তখন কি ভবিষ্য তহবিলের বাধ্যবাধকতা থাকবে না? যদি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাংগঠনিক কাঠামো এমনভাবে সাজিয়ে কর্মচারীর সংখ্যা সীমার নিচে রাখার সুযোগ পেতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই যায়।
খসড়াটি আরও বলছে, কর্মচারীদের আগ্রহের ভিত্তিতে ‘প্রগতি’ সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্য তহবিল থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে।
অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার দুটি ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি কর্মচারীর জন্য বেশি কার্যকর, সেটিও স্পষ্ট নয়। এই জায়গায় কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক স্বার্থের তুলনামূলক সুরক্ষা প্রয়োজন।
চাকরি ছাড়তেও কর্মচারীর ওপর বড় বোঝা
স্থায়ী কর্মচারীকে চাকরি ছাড়তে হলে ৬০ দিনের নোটিস দিতে হবে। অর্থাৎ একজন কর্মচারী নতুন চাকরিতে ভালো সুযোগ পেলেও দুই মাসের নোটিসের বাধার মুখে পড়তে পারেন। অন্যদিকে মালিক স্থায়ী কর্মচারীর চাকরি ১২০ দিনের নোটিসে শেষ করতে পারবেন।
অর্থাৎ দুই পক্ষের নোটিসের সময় সমান নয়— এটি অবশ্যই নিয়োগকর্তার জন্য অধিক নমনীয়তা তৈরি করে।
আর পদত্যাগের ক্ষতিপূরণও তিন বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর শুরু হচ্ছে। তিন বছরের কম চাকরিতে পদত্যাগ করলে এই ক্ষতিপূরণের কোনো অধিকার নেই।
বাংলাদেশ শ্রম আইনের বর্তমান কাঠামোর সঙ্গেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ তুলনার প্রয়োজন রয়েছে। শ্রম আইনে স্থায়ী শ্রমিকের পদত্যাগের নোটিস ৬০ দিন হলেও নির্দিষ্ট মেয়াদের পর পদত্যাগজনিত ক্ষতিপূরণের কাঠামো ভিন্ন।
তাই যে বিধিমালা শ্রমিকের বাইরে থাকা বেসরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন সুরক্ষা তৈরি করতে চায়, সেটি যেন বিদ্যমান শ্রম-সুরক্ষার তুলনায় কোনো জায়গায় পিছিয়ে না যায়— এ বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।
চাকরি হারালে ক্ষতিপূরণ আছে, কিন্তু চাকরি হারানোর ক্ষমতাও যথেষ্ট বিস্তৃত। খসড়ার ৩৪ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী স্থায়ী কর্মচারীর চাকরি ১২০ দিনের নোটিস দিয়ে শেষ করা যাবে। কারণটি ‘বরখাস্ত’ বা ‘অপসারণ’ ধরনের শাস্তিমূলক কারণ না হলেও চাকরির অবসান ঘটানো সম্ভব। ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য ৩০ দিনের মূল বেতন বা গ্র্যাচুইটি— যেটি বেশি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শুনতে ভালো। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন হলো, ক্ষতিপূরণ দিয়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকি কি সত্যিই কমে, নাকি চাকরিচ্যুতিকে শুধু আর্থিক লেনদেনে পরিণত করে?
একজন কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা শুধু ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না। চাকরি হারানোর সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা, কারণ জানানোর বাধ্যবাধকতা, আপিলের সুযোগ এবং স্বাধীন পর্যালোচনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কর্মচারী এখন হয়তো বছরে তিনটি উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। নতুন প্রবিধান বলছে সর্বোচ্চ দুটি। কেউ হয়তো সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত অর্থ পান। নতুন বিধিমালায় ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের সুযোগ আছে, কিন্তু অতিরিক্ত কাজের অর্থ প্রদানের স্পষ্টতা নেই।
ন্যূনতম সুরক্ষা দিতে গিয়ে যদি বিদ্যমান সুবিধার মানদণ্ডকে নিচে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে সেটি কর্মচারী সুরক্ষা নয়; বরং সুবিধার অবক্ষয়ের একটি বৈধ কাঠামো হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়



