২০ বছর বঞ্চিত ঠিকাদারদের ভাগ্য খুলছে
- সরকারি ক্রয় আইন সংশোধন অধ্যাদেশ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

প্রতীকী ছবি
দুই দশক আগের পুরনো ঠিকাদারদের বিনা বাধায় ফের সুযোগ করে দিতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন লাইসেন্সধারীদের জন্যও রয়েছে সুখবর— এমন কোনো শর্ত দেওয়া যাবে না, যাতে তাদের সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণ সীমিত করে। এমনকি সরকারি কাজের অভিজ্ঞতাকে ক্রয়চুক্তিতে বাধ্যতামূলক করা যাবে না। এসব রেখে গতকাল রবিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২১তম মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বলা হলেও বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ভিন্ন চোখে। তাদের মত, এই সংশোধনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। অংশীজনের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই আইনটি সংশোধনকেও তারা হতাশাজনক বলেছেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইনটি সংশোধন করা হয়েছে মূলত ২০ বছর ধরে বঞ্চিত ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তাদের সরকারি কেনাকাটায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে। কারণ রাজনৈতিক কারণে ওয়ান- ইলেভেনের পর থেকেই বিএনপি-জামায়াত ঘরানার ব্যবসায়ীরা সরকারি কেনাকাটায় অংশ নিতে পারেননি। তাদের সর্বোচ্চ বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিরোধী মতের ব্যবসায়ীরা দরপত্রে অংশ নিলেই খুনখারাবির মতো ঘটনা ঘটেছে। রয়েছে গুমের ঘটনাও। আওয়ামী সরকারের সময়ে এককভাবে তাদের দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাই সরকারি কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করেছেন— যা ওপেন সিক্রেট বা প্রকাশ্য বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তাদের রেখে যাওয়া আইনের শর্তের বেড়াজালে সরকারি কেনাকাটায় অংশ নিতে পারছেন না বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক ব্যবসায়ীরা। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই মূলত আইনটি সংশোধন করা হয়েছে।
সংশোধনী খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, “২০ বছরের পুরনো ঠিকাদারদের টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। সেই ধারায় বলা হয়েছে— ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ অর্থ এই সংশোধনী আইন কার্যকর হওয়ার তারিখের পূর্ববর্তী অনধিক ২০ বছরের মধ্যে বৈধ নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও সরকারি ক্রয়কার্যে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় সুযোগ বা অনুকূল পরিবেশের অভাবে কোনো সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে নাই বা অংশগ্রহণ করে নাই এমন ব্যক্তি।”
নতুন ঠিকাদারদের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনের ২৫ ধারাকে বিন্যস্ত করে দুটি নতুন উপধারা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর একটি ২৫(২)-এ বলা হয়েছে, ‘েযাগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি বা নবীন উদ্যোক্তাগণের অংশগ্রহণ সীমিত করে।’
অন্যটি ২৫ ধারার (৩) উপধারা। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কেবল দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা, উচ্চবার্ষিক টার্নওভার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের অভিজ্ঞতা অথবা একক বৃহৎ চুক্তি সম্পাদনের অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে, ক্রয়কারী বিশেষ ক্ষেত্রে ক্রয়কার্যের প্রকৃতি, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশেষ শর্ত আরোপ করতে পারবে।’
দেশীয় পণ্য ক্রয়ে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে নতুন খসড়ায়। এতে ধারা ২৬-এর উপধারা (২)-এ নতুন করে শর্ত আরোপ করে বলা হয়েছে, ‘দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা, নতুন দরপত্রদাতা, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র দরদাতা বা নারী দরপত্রদাতা অথবা সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তিদের ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সরকার যোগ্যতার শর্তাদি শিথিল করতে পারবে।’
তবে অংশীজনের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই আইনটি সংশোধনে হতাশা প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি গতকাল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এটিও হতাশাজনক যে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে আইনটি সংশোধনের সুপারিশ করে এলেও সরকার কোনো ধরনের আলোচনা বা সম্পৃক্ততা ছাড়াই একতরফাভাবে তাড়াহুড়ো করে এটি এগিয়ে নিচ্ছে; যা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা নিয়েও উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।’
তিনি আরও বলছিলেন, “এটিকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যদি দেখা যায় যে— কোনো দরদাতা নতুন বা সুযোগবঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত কারিগরি ও বিষয়ভিত্তিক শর্তাবলি পূরণ করে সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অন্যথায়, পর্যাপ্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘বিশেষ শর্ত’ আরোপের বিধানটির আওতায় এ ধরনের পক্ষপাতিত্বের সুযোগও তৈরি হয়েছে।”
সংসদ কার্যকর না থাকায় শিগগিরই অধ্যাদেশ আকারে জারি হতে যাওয়া এ সংশোধনীতে রাষ্ট্রীয় জরুরি ও বিশেষ পরিস্থিতিতে কেনাকাটার বিকল্প পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সংশোধনীতে নতুনদের অপ্রয়োজনীয় শর্ত দিয়ে আটকানো; কিংবা যারা ২০ বছর ধরে লাইসেন্স করে বসে আছেন তাদের কাজ পাওয়ার পথ সহজ করা হয়েছে। আশা করি সেগুলোর অপব্যবহার হবে না। সেভাবেই বিধিমালা তৈরি করা হবে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিসভায় পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে— সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সম-আচরণ ও অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতেই সরকারি ক্রয়ের মূল আইনি কাঠামো হিসেবে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ প্রণয়ন করে, যা ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি কার্যকর হয়। পরে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া যুগোপযোগী ও সহজতর করার জন্য এ পর্যন্ত ৬ দফায় সংশোধন করা হয়েছে, যা চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল পাস এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়। বর্তমানে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় বিবেচিত হওয়ায় সরকারি ক্রয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা; ক্রয়কার্যে অধিকতর প্রতিযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র, নারী দরপত্রদাতা ও সুযোগবঞ্চিত দরপত্রদাতাদের বিশেষ ব্যবস্থার সংরক্ষণ, ক্রয়চুক্তি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিধানের সম্প্রসারণ ইত্যাদি যুগোপযোগী পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে জাতীয় সংসদে উঠেছিল ই-টেন্ডার সহজীকরণের দাবি। গত ৩০ আগস্ট বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি তোলেন। তিনি বললেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেখানে অল্প সময়ে এ প্রক্রিয়া সহজ করতে পেরেছিল, সেখানে বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হলেও তা হয়নি। এ বিষয়ে আর কত সময় লাগবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনার একপর্যায়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারি দরপত্রে কথিত ‘সিন্ডিকেট’ ও প্রতিযোগিতার বাধা দূর করার জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ও রুলস যুগোপযোগী করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগের সময়ে আইন ও বিধির আওতায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যার ফলে বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন— এমন অভিযোগ সরকার শনাক্ত করেছে। তবে এ বিষয়ে রাতারাতি ব্যবস্থা না নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভার একটি সাবকমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি ওই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন এবং একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটি দ্রুত সংসদের সামনে আনার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। এর তিন সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিল।



