বার্লিনে বামপন্থীদের জয়, চাপে চ্যান্সেলর মের্ৎস

জার্মানির বার্লিনে রাজ্য নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে বুথফেরত জরিপের ফল ঘোষণার সময় বক্তব্য দিচ্ছেন দ্য লেফট পার্টির শীর্ষ প্রার্থী এলিফ এরাল্প। ছবি: রয়টার্স
জার্মানির বার্লিন রাজ্য নির্বাচনে জয় পেয়েছে কট্টর বামপন্থী দল দ্য লেফট পার্টি। রবিবারের এই নির্বাচনের ফল দেশটির পূর্বাঞ্চলে উগ্র ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের অগ্রযাত্রায় অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। তবে এই ফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জন্যও আরেকটি ধাক্কা হিসেবে এসেছে।
এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে মের্ৎসের সিডিইউ। সেখানে দলটি প্রথমে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফল নিয়ে কোনোমতে পার্লামেন্টে টিকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর দলটি ৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় সীমার নিচে নেমে যায়।
মের্ৎস এই ফলকে দলের জন্য ‘বিপর্যয়’ বলেছেন। ওই রাজ্যে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার পথে রয়েছে। তবে অন্য দলগুলো তাদের সঙ্গে কাজ করতে রাজি নয়। ফলে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
দুটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলের পর ম্যার্জের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। তার জনপ্রিয়তা কমেছে। এমনকি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে।
তবে রবিবার বার্লিনে দলের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের মের্ৎস বলেছেন, তিনি দায়িত্বে থাকছেন। অর্থনীতি, কর ও কল্যাণব্যবস্থা নিয়ে তার সরকারের সংস্কার পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ম্যার্জ বলেন, ‘সংস্কার করতেই হবে। আমি এ দায়িত্ব নিচ্ছি, কারণ আমি আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।’
এবারের বার্লিন নির্বাচনে অর্থনীতির দুরবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাবও ছিল। চলতি বছর অনুষ্ঠিত অন্য চারটি রাজ্য নির্বাচনেও একই বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বার্লিনে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বাড়িভাড়া।
চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, বার্লিনে দ্য লেফট পার্টি পেয়েছে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট। ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে ১৯ শতাংশ। এএফডি পেয়েছে ১৬ শতাংশ এবং মধ্য-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) পেয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।
এই ফলের ফলে সিডিইউকে সরিয়ে বার্লিনের মেয়র পদে দ্য লেফট পার্টির প্রার্থী এলিফ এরাল্পের আসার পথ তৈরি হয়েছে। ভোট গণনা চললেও দলটির জয় তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়।
দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে এরাল্প বলেছেন, ‘আজ থেকে আমরা সবাই মিলে বার্লিন বদলাব।’
৪৫ বছর বয়সী এরাল্পের বাবা-মা তুরস্কের বামপন্থী ছিলেন। ১৯৮০ সালের অভ্যুত্থানের পর তারা জার্মানিতে পালিয়ে যান। নির্বাচনী প্রচারে এরাল্প বার্লিনের বাড়িভাড়া বৃদ্ধিকে প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।
ফল ঘোষণার পর তিনি বলেন, রাজধানীতে ভাড়াবাড়ির ক্রমবর্ধমান সংকট এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা।
এরাল্প ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন সংস্থাগুলোকে জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার আবাসন রাষ্ট্রের মালিকানায় নেওয়া হতে পারে। ২০২১ সালের এক গণভোটে বার্লিনের ৫৮ শতাংশ ভোটার আবাসন জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এসপিডির মহাসচিব টিম ক্লুসেনডর্ফ বলেছেন, আবাসন সংস্থাগুলো জাতীয়করণে প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউরো খরচ হতে পারে। ইনফ্রাটেস্ট ডিম্যাপের এক জরিপেও দেখা গেছে, মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ এই পরিকল্পনার পক্ষে।
দ্য লেফট পার্টি বার্লিনে সরকার গঠনে এসপিডি ও পরিবেশবাদী গ্রিনস পার্টির সঙ্গে জোট করতে পারে। দুই দলই এমন জোটে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে গ্রিনস পার্টির নেতা ফেলিক্স বানাসজাক বলেছেন, দ্য লেফট পার্টির বার্লিন শাখার কিছু অংশের বিরুদ্ধে ওঠা ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেছেন, ‘ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার দরকার। তা না হলে আমাদের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হবে না।’
দ্য লেফট পার্টি পদ্ধতিগত ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি বলেছে, ইহুদিবিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও যৌনবাদসহ সব ধরনের ‘গোষ্ঠীভিত্তিক বিদ্বেষের’ বিরুদ্ধে তারা।
এদিকে এএফডি বার্লিনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করেছে। ৬ সেপ্টেম্বর স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে সাফল্যের পর মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নেও দলটি সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার পথে রয়েছে।
তবে শুধু এএফডির উত্থানই এবারের নির্বাচনের বড় বার্তা নয়। মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানপন্থী মূলধারার দলগুলোর প্রতি অনাস্থা থেকে দ্য লেফট পার্টিও লাভবান হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি ও রয়টার্স






