একদিনের জন্য উঠল ফুটপাত
- হৃদরোগ হাসপাতালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে প্রধান ফটকের সামনের দোকান উচ্ছেদ
- অনুষ্ঠান শেষে আবার বসার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনের ফুটপাত। ছবি: আগামীর সময়
প্রতিদিন যেখানে পা ফেলার জায়গা পাওয়া কঠিন, অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেও যেখানে তৈরি হয় ভোগান্তি—জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সেই প্রধান ফটক রাতারাতি হয়ে গেল ফাঁকা। নেই ফুটপাতের দোকান, নেই মানুষের জটলা। হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল হাসপাতালের সামনের চিত্র।
তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী নয়। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষ হলেই আবার আগের চিত্র ফিরে আসবে—এমনটাই জানালেন দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা করা দোকানিরা।
আগামীকাল শুক্রবার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাত থেকে দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের প্রধান ফটকের দুই পাশে থাকা বিভিন্ন দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ফটকের সামনে তৈরি হয়েছে প্রশস্ত জায়গা। অন্যান্য দিনের তুলনায় রোগী ও স্বজনদের চলাচলেও ছিল স্বস্তি। ফটকের ভেতরে একটি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ও কয়েকটি গাড়ি পার্কিং করতেও দেখা যায়।
দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের আগমন উপলক্ষে ফুটপাত পরিষ্কার করা হয়েছে।
হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা ফাতেমা আক্তার প্রথমে ফটকের সামনে দোকানপাট দেখে ভেতরে প্রবেশ করেন। বের হওয়ার সময় দেখেন, কিছুক্ষণ আগেও যেখানে দোকানপাটে ভরা ছিল, সেখানে এখন একেবারেই ফাঁকা।
বিষয়টি নিয়ে তিনি সেখানে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য রাশেদুলকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মামা, এখানে কি হয়েছে?’
জবাবে রাশেদুল বলেন, ‘কাল প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো সাখাওয়াত হোসেন আসবেন তো, তাই এগুলো পরিষ্কার করে দিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠান শেষ হলে শনিবার থেকে আবার দোকানগুলো বসতে পারে।
ফটকের পাশে দীর্ঘদিন ধরে রুটির দোকান করেন সিদ্দিক। আগের দিনও তার দোকানে বসে রুটি খাওয়া হয়েছিল। ফুটপাত উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মামা, ৩০ বছর ধরে এই হাসপাতালে কাজ করি তো। এমনই হয়। যখন অনুষ্ঠান হয়, তখন দোকানপাট উঠিয়ে দেয়। অনুষ্ঠান শেষ হলে আবার সবাই বসে পড়ে।’
শুধু দোকানিরাই নন, হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদেরও অভিযোগ—ফটকের সামনে নিয়মিত দোকান ও মানুষের ভিড় থাকায় হাসপাতালে প্রবেশ ও বের হতে ভোগান্তি হয়। অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়।
এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘যদি সব সময় এমন থাকত, তাহলে কত ভালো হতো। মানুষের জ্বালায় ভেতরে ঢোকাই যায় না। অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেও কষ্ট হয়। আজ দেখেন, কোনো দোকান নেই, মানুষের ভিড়ও নেই—কত সুন্দর।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, ‘আগামীকাল সরকারি লোকজন আসবেন। সে কারণে জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে সিটি করপোরেশনের লোকজন দোকান সরিয়েছে। তবে মূল কারণ হলো আগামীকালের অনুষ্ঠান।’
তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠান শেষ হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।’
হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রাতারাতি এমন পরিবর্তনে প্রশ্ন উঠেছে—রোগীদের স্বার্থে জায়গাটি সব সময়ই কি এমন উন্মুক্ত রাখা সম্ভব নয়? বিশেষ কোনো অতিথি আসলেই যদি ফুটপাত, দোকান ও জটলা সরানো যায়, তাহলে প্রতিদিন রোগী ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুবিধার্থে কেন একই ব্যবস্থা রাখা হবে না?
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে এক রাতের জন্য বদলে যাওয়া হাসপাতালের প্রধান ফটক তাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—পরিষ্কার ও উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু তা কি শুধু অতিথি আসার দিনেই?





