ব্যক্তিমালিকানায় ট্রেন চালাতে চায় সরকার
- ঠিকাদারের সঙ্গে রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা
- ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ২০ বছর ট্রেন চালাতে চায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাস, লঞ্চ ও উড়োজাহাজের মতো এবার ব্যক্তিমালিকানায় ট্রেন চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বৈঠক হয় গতকাল মঙ্গলবার। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, রেলের লাভ-ক্ষতিসহ সামগ্রিক বিষয়ে আরও আলোচনার পরই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
২০ বছরের জন্য বেসরকারি মালিকানায় ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দিয়েছে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং। এতে ট্রেনের বগি, ইঞ্জিন কিনবে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু রেললাইনে সেই ট্রেন চালাবে রেলওয়ে। জ্বালানি সরবরাহ, বড় ধরনের মেরামতকাজ, জনবল, টিকেটিং ব্যবস্থা এবং পরিচালনা কার্যক্রমসহ সবকিছুই করবে সরকারপক্ষ। আর ব্যবসা করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। গত ১৯ মে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেটি ২৩ জুন সচিবের দপ্তরে পাঠান রেলমন্ত্রী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুই ঘণ্টা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বৈঠক হয়।
ঠিকাদারের প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্রেনগুলো থাকবে ঢাকা ও কক্সবাজারে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেবে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মেরামতের কাজ করতে হবে রেলওয়েকে। সরকারের লোকো শেড, ওয়ার্কশপ, সিক লাইন, ওয়াশ পিটসহ সব অবকাঠামো ব্যবহার করবে তারা। পাশাপাশি রেলওয়ের সান্টিং (অন্য ট্রেন দিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বা স্বাভাবিক কারণে ট্রেন টেনে আনা) ইঞ্জিন ব্যবহার করতে চায়।
বর্তমানে রেলওয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অন্যতম লাভজনক রুট হচ্ছে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা। এই পথ বিরতিহীন। ঢাকা থেকে ট্রেন ছেড়ে চট্টগ্রামের আগে কোথাও থামে না। ফিরতি পথেও সেটিই হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চাওয়ার রুটও এটিই। অন্য কোনো রুটে ট্রেন চালাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি রাজি নয়।
এখন রেলওয়ের দুটি ট্রেন কক্সবাজার রুটে চলাচল করে। এই রুটে প্রাথমিক পর্যায়ে চার জোড়া ট্রেন চালাতে চায় ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রতি ট্রেনে কোচ (বগি) থাকবে ২২টি। পরে আরও এক জোড়া ট্রেন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ১০৮টি কোচ ও ৬টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কিনতে চায় ঠিকাদার। এর মধ্যে এসি চেয়ার ৩২টি, এসি কেবিন ১২, শোভন চেয়ার ৩২, পাওয়ার কার ৪ ও গার্ড ব্রেক ৮টি সংগ্রহ করা হবে। এসব কেনা হবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইন্দোনেশিয়া থেকে। আয়ুষ্কাল থাকবে ২০ বছর।
রেলভবনে হওয়া বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। এতে অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ রেলের ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা অংশ নেন। বৈঠকে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র বলছে, সরকারি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মেরামত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় আপত্তি তোলা হয়েছে। বৈঠকে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেলওয়ে নিজস্ব অবকাঠামোতে নিজেদের সব ট্রেনের মেরামত করার সক্ষমতা নেই। এমন বাস্তবতায় বেসরকারি ট্রেন তারা কীভাবে মেরামত করবেন— সেই প্রশ্ন তোলা হয়। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও রেলের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়। নিয়মিত বাকিতে রেল জ্বালানি নিয়ে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন থেকে। কিন্তু বেসরকারি ট্রেনের জন্য রেল কেন নিজের নামে বাকিতে তেল নেবে—উঠে সে প্রশ্নও। কিন্তু এগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। আবার রেলের মুনাফা কীসে, সেটির জবাবও অধরা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বশির আহমেদের মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার কল করা হয়েছে। রিং হলেও রিসিভ করেননি।
কথা হলো রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিচালন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের সঙ্গে। আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি এবার প্রথম আলোচনায় উঠল। কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব, রেলের লাভ-ক্ষতি কী হবে— সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রাথমিক আলাপেই চূড়ান্ত হবে না— এটাই স্বাভাবিক।’
এদিকে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রেলওয়ের সঙ্গে ট্রেন চালিয়ে লভ্যাংশ ভাগ করার কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ ট্রেন চালিয়ে যা-ই লাভ হোক না কেন, সেটি প্রতিষ্ঠানটি একাই নিয়ে যাবে। তবে তাদের প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, প্রতি জোড়া ট্রেনে বছরে সরকারকে ৫ কোটি টাকার রাজস্ব দেওয়া হবে। আর ট্রেনের বগি-ইঞ্জিনের আয়ু যেহেতু ২০ বছরের, তাই সরকারের সঙ্গে ২০ বছর ট্রেন চালানোর চুক্তি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘কক্সবাজার সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট এবং এটি লাভজনকও বটে। যাত্রীর চাহিদা প্রচুর। আপাতত কোচ, লোকোমোটিভ সংগ্রহ করার আগ পর্যন্ত রেল চাইলে নিজ উদ্যোগেই অন্য জায়গায় ট্রেন কমিয়ে এখানে বাড়াতে পারে। এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক রুটে ব্যবসা করতে চাইছে নিজেদের লাভের জন্য। যাত্রীর সেবা বা রেলের উপকার করার জন্য নয়।’
যদিও কোম্পানিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, করপোরেট আয়কর, টিকিটের ভ্যাট, যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক, কর্মসংস্থান কর, রেললাইন ব্যবহার করতে দেওয়ার ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ফি এবং রয়্যালটির মাধ্যমে কোনো মূলধন ছাড়াই আয় করবে রেলওয়ে। বেসরকারি কোম্পানি রোলিং স্টক (ট্রেন সেটে যা যা থাকে) কেনায় রেলের কোনো বিনিয়োগসংক্রান্ত ঝুঁকি নেই। এমনকি প্রকল্পটি বেসরকারি হওয়ায় সরকারের বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। কক্সবাজার পথে বেশি ট্রেন চললে সরকারের রাজস্ব বেশি হবে। বেসরকারি খাতে সেবার মান যেমন বাড়বে, এতে রেলের সুনাম বাড়বে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি রোলিং স্টকে ট্রেন চালানোর ভাবনাকে কীভাবে দেখছে— এমন প্রশ্নে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (অধ্যাপক) শামছুল হক শুরুতেই বলছিলেন, ‘এটি ঠিক হবে না।’ তার মতে, ‘উল্টো হলে ভালো হলেও হতে পারত। আমাদের এখানে সরকার কোনো কিছু কিনতে পারে ভালো, নির্মাণ করতে পারে ভালো। কিন্তু সেবা দিতে পারে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সেবাটি ভালো দিতে পারে। আর সরকারি পর্যায়ে রোলিং স্টক কেনা লাভজনক। বেসরকারিতে নয়। তাই এমন কিছু করার আগে সরকারের বারবার ভাবা উচিত।’
এদিকে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যমান রেল আইন পরিবর্তন করতে হবে সরকারকে। ব্রিটিশ আমলের ‘দ্য রেলওয়েজ অ্যাক্ট, ১৮৯০’ বাতিল করে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে আইনের খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায়। নতুন আইনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক (পিপিপি) রেল পরিচালনার সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে। খসড়া আইনে বাংলাদেশ রেলওয়েকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘ট্র্যাক অ্যাকসেস’ চুক্তি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় নির্ধারিত ফি দিয়ে সরকারি রেললাইন ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেন চালাতে পারবে। আইনের ১৫১ ধারায় তাদের নিজস্ব ইঞ্জিন ও বগি পরিচালনার সুযোগও রয়েছে। এতে যাত্রী, পার্সেল ও পণ্য পরিবহনের জন্য আলাদা চুক্তি করা যাবে।




