মোটরসাইকেলটির কী হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্যারের দরকার বলে কথা! পারলে আকাশের চাঁদ এনে দিতে চান জুনিয়র সহকর্মী। চাহিদাটি ব্যক্তিগত হলে তো পোয়াবারো। স্যারও খুশি— ভবিষ্যৎ সুবিধার লোভে জুনিয়রও। যানজট এড়িয়ে চলতে বিমান প্রেসের মহাব্যবস্থাপক মোটরসাইকেল কিনিয়েছিলেন। নিজের নামে গাড়ি থাকার পরও। স্যার বদলি হওয়ায় ফুরায় প্রয়োজন। ধুলোবালি পড়ছে, অকেজো হচ্ছে। নতুন আসা জুনিয়রও দেখলেন— বিপদ আসছে তেড়ে! ঝড়ের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন ৩৬০ ডিগ্রি। ফাইল নড়ছে, বৈঠক হচ্ছে— কিন্তু সমাধান নেই। প্লেন নয়, বড়কর্তারা চিন্তিত— মোটরসাইকেলটির এখন কী হবে!
কেনার সময় ফাইলে এমনভাবে যুক্তি দেওয়া হয়, যেন মনে হয় ওটাই সবচেয়ে বড় সংকট প্রতিষ্ঠানে। মোটরসাইকেল কেনার নোট উপস্থাপন ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় ‘রাজ্যের প্রয়োজন’। বিমানের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগ নাকি বুকলেট ম্যাগাজিন ব্রোশিউরসহ কয়েক হাজার প্রকারের মুদ্রণসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহ করে! প্রতিদিনই বিভিন্ন দরকারে এখানে-সেখানে যেতে হয় কর্মীদের। ঢাকা শহরের দুঃসহ ট্রাফিক ঠেলে যাতায়াতে কর্মঘণ্টা নষ্ট— দিতে হয় ভাতা। এ অবস্থায় প্রেসের প্রয়োজনে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব দেন শাকিল মেরাজ। যিনি ছিলেন প্রেসের মহাব্যবস্থাপকের চেয়ারে।
কেনায় প্রলুব্ধ করতে নোটে ওঠে বাহারি যুক্তি, ‘প্রেস একটি শিল্পকারখানা, চাকা ঘুরলেই পয়সা।’ ‘প্রেসে রয়েছে দক্ষ জনবল ও উদ্যোগী তরুণ কর্মী বাহিনী।’
আদতে মোটরসাইকেল চালানোর কোনো জনবলই ছিল না। ডেসপাস রাইডার পদ শূন্য অনেক দিন ধরেই। অনুসন্ধানে মেলে মোটরসাইকেলটি নিজের প্রয়োজনেই কিনিয়েছিলেন শাকিল। রাজধানীর শ্যামলীর হলি লেন থেকে ফার্মগেটের প্রেসে যাওয়া-আসায় পথের জট এড়াতেই এ ব্যবস্থা। অথচ এই বিমানকর্তারও বাহারি গাড়ি ছিল। সেটায়ও চড়তেন, আবার যানজট দেখলে চেপে বসতেন বাইকে। গোয়েন্দাদের রাডারেও ধরা পড়ে বিষয়টি, ‘শাকিল মেরাজ মহাব্যবস্থাপক (মুদ্রণ ও প্রকাশনা) থাকাকালে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিমান প্রশাসনকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে বিমানের টাকায় আনুমানিক ১,৬০,০০০ টাকায় ১২৫ সিসি ইঞ্জিনের একটি মোটরসাইকেল কেনেন।’
অনেকটা দ্রুতগতিতে ৩৭ দিনের মধ্যেই অগ্রিম টাকা দিয়ে মাসমিনু মোটরস থেকে কেনা হয় মোটরসাইকেল। এর আগেও এই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক মোটরসাইকেল কেনা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় বীমার টাকা। মোটরসাইকেলটি পায় রেজিস্ট্রেশন, ঢাকা মেট্রো-হ-৬১-৫১০৩।
শাকিল মেরাজকে নিয়ে মোটরসাইকেলটি চালাতেন বিমানের মোটর ট্রান্সপোর্ট অপারেটর মোহিদুল ইসলাম। মহাব্যবস্থাপক থেকে বদলি হয়ে প্রেস ছাড়েন তিনি। এরপর পরিচালক পদে পদোন্নতি পান।
পরিচালক থাকাবস্থাতেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নিজে সেটা সামনে থেকে সামলেছেন। ২০২৪ সালের ৮ জুলাই মোটরসাইকেল নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সামনে এনে শুরু হয় নতুন করে ফাইল চালাচালি। মুদ্রণ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক মীর মো. মোসলেহ উদ্দিন ফাইল তোলেন, সামনে এগিয়ে দেন মহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার। মোটরসাইকেলটির করণীয় নির্ধারণ করতে এই ফাইলযাত্রা। রবিবার পর্যন্ত মোটরসাইকেলের গতি করতে পারেনি বিমান। এর মধ্যে পার হয়ে গেছে ২১ মাস ৯ দিন। ফাইলটি হাতবদল হয়েছে— অর্থাৎ স্বাক্ষর পড়েছে ১২০টি। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর স্বাক্ষরও আছে দফায় দফায়।
‘বিমান এমডির এত সময়!’ বিস্ময় প্রকাশ করলেন সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তার কথা, ‘যে এমডিকে বোয়িং থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার চৌদ্দ এয়ারক্রাফট কিনতে ব্যস্ত থাকতে হয়— তিনি কী করে দেড় লাখ টাকার মোটরসাইকেল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন? এখানে সিস্টেম ডেভেলপ করেনি। আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি।’
ফাইল এত ঘোরাঘুরির কারণ কী। আগামীর সময়ের কাছে থাকা ফাইল বিশ্লেষণে বোঝা যায়— কেউ দায়িত্ব নিতে চান না। মোটরসাইকেল অকেজো পড়ে আছে। সেটা কী করা হবে, তা বাতলে দিলেও বিপদ হতে পারে। তাই দায়সারা সবাই।
মুদ্রণ শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক মীর মো. মোসলেহ উদ্দিন ফাইলে বলেছেন, ‘ডেসপাস রাইডার না থাকায় অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।’ তিনি মোটরসাইকেলটি যানবাহন শাখায় ন্যস্ত করার প্রস্তাব করেন।
জবাবে যানবাহন শাখার উপমহাব্যবস্থাপক কামাল উদ্দীন আহমেদের কথা— ‘যানবাহন বিভাগে চারটি মোটরসাইকেল কিন্তু চালক বা ডেসপাস রাইডার দুজন। চালকের অভাবে নিজেদের মোটরসাইকেলগুলোই ব্যবহার হচ্ছে না।’ তিনি মোটরসাইকেলটি জিএসই শাখাকে দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
পদোন্নতি পেয়ে শাকিল মেরাজ তখন জিএসই বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। তিনি স্বাভাবিকভাবেই লুফে নিয়েছেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সেই সময়ের এমডি ও সিইও মো. সফিকুর রহমান, ‘জিএসইতে ডেসপাস রাইডার/চালকের কোনো সেটআপ নাই।’ কে মোটরসাইকেল চালাবে তা জানতে চান তিনি। এই প্যাঁচ কাটিয়ে আর বের হতে পারেনি জিএসই বিভাগ। একপর্যায়ে জানা যায় মূল নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ফাইল চালাচালির সাড়ে ৮ মাস পর ২০২৫ সালের ১৫ মে এসে পরিচালক প্রশাসন আব্দুর রফিক ফাইলে লিখেছেন, ‘তাহলে মোটরসাইকেলটির কী হবে?’
এরপর দাবাড় বোর্ডে চাল জটিল হতে থাকে। যানবাহন শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ভূঁইয়ার শক্ত অবস্থান ফাইলে, ‘মুদ্রণ বিভাগ মোটরসাইকেল না কিনে যানবাহন শাখা থেকে নিতে পারত। প্রয়োজন শেষে আবার ফেরত দিতে পারত।’ তাহলে এত জটিল হতো না বলে মত যানবাহন ব্যবস্থাপকের। এরপর ফাইল ফেরে আদি মুদ্রণ বিভাগে।
বিভাগপ্রধান তাহেরা খন্দকার প্রস্তাব দেন বিক্রির। তাদের প্রস্তাবে সভা করার বিষয়টিও ছিল। কিন্তু তা ভেস্তে যায় পরিচালক প্রকিউরমেন্ট ও লজিস্টিক সাপোর্টের পরিচালক মমিনুল ইসলামের অবস্থানে, ‘আমি বুঝতে পারছি না এই মোটরসাইকেলটি কেন কেনা হয়েছিল?’ তিনি নিলাম ডাকার কথা বললেন।
নিলামে তোলার জন্য এমডি ও সিইওর অনুমতি দরকার। পরিচালক অর্থ হয়ে ফাইল যায় তার কাছে। কিন্তু গত ৭ জানুয়ারি অর্থের পরিচালক নওসাদ হোসেনের কড়া নির্দেশ, ‘মোটরসাইকেল কেনার কী প্রয়োজন ছিল, তিন দিনের মধ্যে চাই তার রিপোর্ট।’
সেই তিন দিন শেষ হয়নি এখনো! সমস্যারও কোনো সুরাহা হয়নি। সাইকেলটি এখনো পড়ে আছে বিমানের প্রেসে।
যার বিরুদ্ধে নিজের প্রয়োজনে প্রভাব খাটিয়ে মোটরসাইকেল কেনার অভিযোগ, তিনি কি আর কথা বলতে চান! তারপরও প্রতিবেদকের দায়িত্ব বলে কথা। ফোনে পাওয়া যায় শাকিল মেরাজকে। অভিযোগ শুনে তার কথা, ‘আমি তো আর বিমানে নেই।’
যখন ছিলেন তখনকার অভিযোগ। প্রতিবেদক মনে করিয়ে দিলে প্রতিউত্তর মেলে, ‘আমি এখন মেট্রোতে।’
মেট্রো থেকে নেমে কি একটা ফোন দেবেন? প্রতিবেদকের প্রশ্নে কোনো সাড়া দিলেন না শাকিল মেরাজ।




